
বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পৃষ্ঠদেশের তাপমাত্রা পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। এটি ২০২৪ সালের মার্চ মাসে রেকর্ড করা ২১.০৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং ২০২৩ সালের আগস্টের ২০.৯৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে।
সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, দক্ষিণ গোলার্ধে গ্রীষ্মকাল থাকায় মার্চ ও এপ্রিল মাসে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা শীর্ষে থাকে এবং পরবর্তীতে তা কমতে শুরু করে। তবে বছরের এই সময়ে এসে এমন অভূতপূর্ব উষ্ণতা বিশ্বজুড়ে জলবায়ু বিজ্ঞানীদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরে সক্রিয় 'এল নিনো' প্রভাবের কারণে সমুদ্রে অতিরিক্ত তাপ জমা হচ্ছে। তবে কেবল এল নিনোই নয়, যুগের পর যুগ ধরে অনিয়ন্ত্রিতভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে সৃষ্ট মানবসৃষ্ট জলবায়ু পরিবর্তনই সমুদ্রের এই দীর্ঘস্থায়ী উষ্ণায়নের মূল অনুঘটক।
জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা অনুযায়ী, সমুদ্রের অতিরিক্ত তাপমাত্রা সামুদ্রিক তাপপ্রবাহ বা ‘মেরিন হিটওয়েভ’-এর ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। এর ফলে সামুদ্রিক প্রবালপ্রাচীর, জলজ উদ্ভিদের আবাস্থল এবং সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র ধ্বংসের মুখোমুখি হচ্ছে। একই সাথে সামুদ্রিক মাছের স্থান পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক মৎস্য সম্পদ ও সামুদ্রিক অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের 'কোপার্নিকাস ক্লাইমেট চেঞ্জ সার্ভিস'-এর তথ্য মতে, ১৯৯০-এর দশকের তুলনায় বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সামুদ্রিক তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব ও দিনের সংখ্যা তিন গুণেরও বেশি বেড়েছে।
সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়লে তাপীয় প্রসারণের ফলে পানির আয়তন বৃদ্ধি পায়, যা সরাসরি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এছাড়া উত্তপ্ত সমুদ্র বায়ুমণ্ডলে অতিরিক্ত জলীয়বাষ্প ও শক্তি জোগান দেয়, যার ফলে বিভিন্ন অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও আকস্মিক অতিবৃষ্টির মতো তীব্র প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রকোপ বাড়ছে।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, মানবসৃষ্ট অতিরিক্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণে সমুদ্র অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে। তবে সমুদ্রের পানি যত উষ্ণ হয়, তার কার্বন শোষণের স্বাভাবিক ক্ষমতা তত হ্রাস পায়। ফলে ভবিষ্যতে বিশ্ব উষ্ণায়ন রোধে সমুদ্রের এই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনেকটাই দুর্বল হয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।