হবিগঞ্জের মাধবপুরে হাত বাড়ালেই মিলছে মাদক—এমন অভিযোগ উঠেছে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। সীমান্তবর্তী অঞ্চল হওয়ায় ভারতীয় ফেনসিডিল, স্কাফ সিরাপ, ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের সহজলভ্যতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে। বিশেষ করে তেলিয়াপাড়া চা বাগানের নতুন টিলা, ‘বুলেট’ এলাকা, উড়িষ্যা লাইন ও তেলিয়াপাড়া রেলওয়ে স্টেশনসংলগ্ন এলাকায় মাদক কেনাবেচা ও সেবনের একাধিক আস্তানা গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ স্থানীয় বাসিন্দাদের।
মাদকের করাল গ্রাসে উড়তি বয়সের যুবক-যুবতীসহ স্কুল-কলেজপড়ুয়া ছাত্রছাত্রীরা দিন দিন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে বলে আশঙ্কা করছেন অভিভাবক ও সচেতন মহল। তাদের অভিযোগ, সহজে মাদক পাওয়ার সুযোগ থাকায় কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ ধীরে ধীরে মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে পড়াশোনা, পারিবারিক বন্ধন ও সামাজিক মূল্যবোধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম নিয়েও তৈরি হয়েছে গভীর উদ্বেগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, তেলিয়াপাড়া চা বাগানের নতুন টিলার ‘বুলেট’ এলাকায় চন্দ্র গোয়ালা নামে এক ব্যক্তি ভারতীয় স্কাফ সিরাপসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব্যের ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। তার সঙ্গে কয়েকজন যুবক মাদক বিক্রির কাজে জড়িত রয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। মাদক বিক্রির কাজে তরুণদের ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও দাবি স্থানীয়দের।
অন্যদিকে, তেলিয়াপাড়া চা বাগানের উড়িষ্যা লাইনের একটি বাড়িতে ফেনসিডিল, স্কাফ সিরাপসহ বিভিন্ন ভারতীয় মাদকদ্রব্য বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বাগানের বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে সহজেই মাদক পাওয়া যাচ্ছে। ফলে কিশোর ও তরুণদের একটি অংশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে।
রেলস্টেশন ঘিরেও মাদকের আসর
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কয়েক বছর আগেও তেলিয়াপাড়া রেলওয়ে স্টেশন বাজার এলাকায় প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা কিংবা সেবনের কোনো আস্তানা ছিল না। তবে সম্প্রতি স্টেশনের পূর্ব পাশে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের একটি আসর গড়ে উঠেছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজশাহী থেকে আসা রফিক মিয়া নামে এক ব্যক্তি তেলিয়াপাড়া রেলওয়ে স্টেশনের পূর্ব পাশে বাড়ি করে সেখানে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের আসর বসিয়েছেন। এর আগে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিজয়নগর উপজেলার ইসলামপুর এলাকায় বসবাসের সময় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। একপর্যায়ে ওই এলাকার যুবসমাজের মধ্যে মাদকাসক্তি বেড়ে যাওয়ায় তাকে এলাকা ছাড়তে হয়েছিল বলেও দাবি তাদের।
মোটরসাইকেলে আসছে বিভিন্ন এলাকার তরুণরা
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, প্রতিদিন আশপাশের এলাকা ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে শত শত কিশোর ও যুবক মোটরসাইকেলে করে তেলিয়াপাড়া চা বাগানে আসেন। তাদের অনেকেই ফেনসিডিল, স্কাফ সিরাপ, ইয়াবাসহ বিভিন্ন ধরনের মাদক সেবনে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দিনের বিভিন্ন সময়ের পাশাপাশি সন্ধ্যার পর বাগানের নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় মাদকসেবীদের আনাগোনা বেড়ে যায়। এতে তেলিয়াপাড়া চা বাগানসহ আশপাশের এলাকার সামাজিক পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
উদ্বিগ্ন অভিভাবক ও সচেতন মহল
অভিভাবকদের অভিযোগ, মাদকের সহজলভ্যতা অব্যাহত থাকলে স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশও এর ভয়াবহ ছোবলে পড়তে পারে। ইতোমধ্যে উড়তি বয়সের যুবক-যুবতীদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বাড়ছে বলে স্থানীয়রা দাবি করছেন।
সচেতন মহলের মতে, একটি তরুণ প্রজন্ম মাদকের করাল গ্রাসে হারিয়ে গেলে এর নেতিবাচক প্রভাব শুধু পরিবারে নয়, পুরো সমাজ ও রাষ্ট্রের ওপর পড়বে। তাই মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি মাদকসেবীদের পুনর্বাসন ও তরুণদের সচেতন করতে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, তেলিয়াপাড়া চা বাগানের মাদকপ্রবণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। একই সঙ্গে মাদকের উৎস, সরবরাহকারী ও বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
তবে যাদের বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠেছে, তাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে মাধবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সোহেল রানা বলেন, “মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত আছে। এ ব্যাপারে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।”