গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর ক্ষমতার ছত্রছায়ায় গড়ে উঠেছে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট, যা সংস্থাটির ভেতরে ‘তিন পাণ্ডব’ নামে পরিচিত। এই বলয়ের মূল চালিকাশক্তি হলেন সংস্থাপন শাখার তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান, সম্প্রতি বদলিকৃত ঢাকা সার্কেল-১-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ বদরুল আলম খান এবং ঢাকা সার্কেল-২-এর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী ড. আবু নাসের চৌধুরী। প্রশাসনিক রদবদল থেকে শুরু করে ঠিকাদারি কাজের টেন্ডার বণ্টন, কমিশন আদায় ও বিতর্কিত রাজনৈতিক তহবিল গঠন—সবকিছুতেই তাদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ উঠেছে।
মোহাম্মদ বদরুল আলম খান: ওএসডি হলেও পেছনে বিস্তর অনিয়ম ও ব্ল্যাকমেইল বাণিজ্য
সম্প্রতি বিভিন্ন অনিয়ম, অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং নারীসংক্রান্ত কেলেঙ্কারির কারণে প্রকৌশলী বদরুল আলম খানকে বদলি করে রিজার্ভে (ওএসডি) পাঠানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রধান প্রধান অভিযোগগুলো হলো:
-
টেন্ডার ও বাজেট জালিয়াতি: মন্ত্রীদের সরকারি বাংলো সংস্কারে টেন্ডার ছাড়া কাজ দেওয়া, অতিরিক্ত ব্যয় দেখিয়ে অর্থ আত্মসাত এবং কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ নিজের পছন্দের ঠিকাদারকে পাইয়ে দেওয়া।
-
গাজীপুরের মেগা প্রকল্পে অনিয়ম: গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে বিএসটিআই সিভিল (১৫.৪১ কোটি টাকা), মেট্রোপলিটন সদর থানা (২০.২৪ কোটি টাকা) এবং তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়াম নির্মাণসহ শতকোটি টাকার কাজে প্রভাব বিস্তার। অতিরিক্ত ব্যয় কমানোর সরকারি নির্দেশ উপেক্ষা করে ঠিকাদারকে ৪ কোটি টাকার অগ্রিম বিল দেওয়ার পরও কাজ অসম্পূর্ণ রাখার অভিযোগ রয়েছে।
-
ফাঁদ পেতে ব্ল্যাকমেইলিং: নারী সহযোগীদের মাধ্যমে সহকর্মী প্রকৌশলীদের ফাঁদে ফেলে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবির অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। খুলনা গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আতিকুল ইসলাম এ ধরনের ব্ল্যাকমেইলের শিকার হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন।
-
বেনামী সম্পত্তি: বাসাবো, উত্তরা, বাড্ডা ও গাজীপুরে বিপুল স্থাবর সম্পত্তি ও ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে, যার একটি বড় অংশ স্বজনদের নামে কেনা।
মুহাম্মদ সারোয়ার জাহান: পে-অর্ডার আত্মসাৎ থেকে বদলি বাণিজ্যের কারিগর
বিভাগীয় মামলা ও নানা বিতর্ক থাকা সত্ত্বেও অধিদপ্তরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাপন শাখার দায়িত্ব পান সারোয়ার জাহান।
-
বদলি সিন্ডিকেট: গত মার্চে মন্ত্রণালয়ের নীতি ভেঙে একদিনেই ৫০ জনের বেশি প্রকৌশলীকে বদলি করার পেছনে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ ওঠে, যা পরে মন্ত্রণালয় হস্তক্ষেপ করে স্থগিত করে। লটারির আগে নিজের পছন্দের ৪১ জনের নাম গোপনে বাক্সে যুক্ত করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
-
বিভাগীয় অপরাধ: গাজীপুরে দায়িত্ব পালনকালে ঠিকাদারের ১০ লাখ টাকার পে-অর্ডার বেআইনিভাবে নগদায়ন করার প্রমাণ পায় তদন্ত কমিটি। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা ছাড়াও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অনুসন্ধান চলছে।
ড. আবু নাসের চৌধুরী: নেপথ্যের নির্দেশক ও কৌশলবিদ
ঢাকা সার্কেল-২-এর দায়িত্বে থাকা আবু নাসের চৌধুরী সিন্ডিকেটের পরামর্শক বা মূল কৌশলবিদ হিসেবে কাজ করেন।
-
কাজ নিয়ন্ত্রণে চাপ: সচিবালয়, হাইকোর্ট ও গুরুত্বপূর্ণ হাসপাতালের মেরামতের কাজ পছন্দের ঠিকাদারদের দেওয়ার জন্য মাঠপর্যায়ের প্রকৌশলীদের ওপর অনৈতিক চাপ সৃষ্টির অভিযোগ রয়েছে।
-
অডিট আপত্তি ও অপচয়: তার অধীনস্থ সার্কেলে সরকারি অর্থ অপচয় ও অনিয়মের কারণে শতাধিক অডিট আপত্তি ঝুলছে। এর আগে বগুড়ায় কর্মরত অবস্থাতেও তার বিরুদ্ধে টেন্ডার জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছিল।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য
উত্থাপিত অভিযোগ সম্পর্কে সারোয়ার জাহান ও আবু নাসের চৌধুরী দাবি করেছেন, তারা কোনো সিন্ডিকেট বা অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নন এবং বদলিসংক্রান্ত সব সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয়ের। যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও বদরুল আলম খানের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান জানিয়েছেন, সিন্ডিকেটের বিষয়টি প্রশাসনের নজরদারিতে রয়েছে। ইতোমধ্যে একজনকে ওএসডি করা হয়েছে এবং তদন্তে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে অভিযুক্ত অন্যদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।