জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদস্য মো. মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে বেনামে বন্ড সুবিধাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, শুল্কমুক্ত সুবিধায় পণ্য আমদানি এবং কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকিতে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে। তাঁর ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে শুল্ক ফাঁকির পণ্য খালাসে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ফারুক হোসেন নামের এক ব্যক্তি দুদক চেয়ারম্যান বরাবর এই অভিযোগটি পেশ করেন। এর আগে গত ২৪ জুন ২০২৬ তারিখে এনবিআরেও একই বিষয়ে একটি অভিযোগ (ট্র্যাকিং নম্বর: ১৩০৮৯৪১০৯০০০০৪) দাখিল করা হয়, যা বর্তমানে 'মতামতের জন্য প্রেরিত' অবস্থায় রয়েছে।
বেনামি প্রতিষ্ঠান ও ৯০ কোটি টাকা ফাঁকির নথি অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের ‘মেসার্স ইউএজিএম বিডি লিমিটেড’ নামের একটি বন্ড প্রতিষ্ঠানের কথা তুলে ধরা হয়েছে। দাবি করা হয়, এটি এনবিআর সদস্য মোয়াজ্জেমের একটি বেনামি ব্যবসা।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, গত ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে এনবিআরের নির্দেশনা সত্ত্বেও ঢাকা (দক্ষিণ) কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট থেকে ইউএজিএম বিডি লিমিটেডকে ‘পিভিসি ফ্লেক্স’ (এইচএস কোড: ৩৯২১.৯০.৯৯) আমদানির অনুমোদন দেওয়া হয়। এই ঘটনায় তৎকালীন বন্ড কমিশনারেটের যুগ্ম কমিশনার কামরুল এবং ডেপুটি কমিশনার ব্যারিস্টার পূরবীর সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে।
পরবর্তীতে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের একটি প্রতিরোধ দল (প্রিভেন্টিভ টিম) কারখানাটি পরিদর্শনে গিয়ে এর সব ধরনের কার্যক্রম ও যন্ত্রপাতি বন্ধ অবস্থায় দেখতে পায়। এই শুল্ক ফাঁকির ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে প্রায় ৯০ কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির একটি মামলার খসড়াও তৈরি করা হয়েছিল।
কাস্টমস হাউস ও কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা অভিযোগে আরও বলা হয়, মোয়াজ্জেম হোসেনের পরিচয়ে মোজাম্মেল নামের এক ব্যক্তি এবং চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের প্রশাসন শাখার রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফ পণ্যচালান খালাসে সরাসরি ভূমিকা রাখেন। অভিযোগকারীর দাবি, রাজস্ব কর্মকর্তা আরিফ নিজে কাস্টমস গেটে থেকে ইউএজিএমের চালান খালাস করান, যিনি স্থানীয়ভাবে এনবিআর কর্মকর্তা মোয়াজ্জেমের ‘ক্যাশিয়ার’ হিসেবে পরিচিত।
এছাড়া, চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের অআইআর (AIR) শাখা গত ১৮ জুন ২০২৬ তারিখে ‘ঈ১০৯৯২৯৬’ নম্বর বিল অব এন্ট্রি লক করলেও পরে তা নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।
চারটি বন্ড লাইসেন্স ও সিআইসি কর্মকর্তা অভিযোগকারীর দাবি, মোয়াজ্জেম হোসেন বন্ড ও প্রশাসন বিভাগে দায়িত্বে থাকাকালে নামে-বেনামে মোট চারটি বন্ড লাইসেন্স গ্রহণ করেন। এসব বন্ডের আওতায় শুল্কমুক্ত সুবিধায় কাঁচামাল এনে তা খোলাবাজারে বিক্রি করে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হতো। বর্তমানে সিআইসিতে কর্মরত যুগ্ম কমিশনার কামরুল এ কাজে সহযোগিতা করেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান পদবি ও তদন্তের দাবি এনবিআরের দাপ্তরিক তথ্য অনুযায়ী, মো. মোয়াজ্জেম হোসেন বর্তমানে সদস্য (মূসক নিরীক্ষা) পদে কর্মরত আছেন। এর আগে তিনি সদস্য (কাস্টমস ও ভ্যাট প্রশাসন) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। পূর্বেও বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হলেও সেগুলোর বিষয়ে আদালতের রায় বা চূড়ান্ত তদন্তের তথ্য মেলেনি।
দুদকে দায়ের করা অভিযোগে ফারুক হোসেন বন্ড লাইসেন্স, বিল অব এন্ট্রি এবং আমদানি-রপ্তানির নথিপত্র অনুসন্ধান করে মোয়াজ্জেম হোসেনসহ অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।