বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার পূর্বাভাস বিশ্লেষণ করে একটি গুরুতর সতর্কবার্তা দিয়েছেন অর্থনীতিবিদ জ্যোতি রহমান। সম্প্রতি সাপ্তাহিক কাউন্টারপয়েন্ট-এ প্রকাশিত ‘এ স্টেট অব ইকোনমিক ইমার্জেন্সি’ শীর্ষক নিবন্ধে তিনি দেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগ খরা, মূল্যস্ফীতির চাপ এবং ব্যাংকিং খাতের ভঙ্গুর দশার চিত্র তুলে ধরেছেন।
তার মতে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের চেয়েও দেশের ভেতরের দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, করপোরেট খাতের আর্থিক সংকট এবং নীতিগত অনিশ্চয়তাই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের বড় অন্তরায়।
আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ প্রাক্কলন অনুযায়ী, বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসছে।
আইএমএফের পূর্বাভাস: ২০২৭ অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরে ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ২ দশমিক ২ শতাংশ করা হয়েছে। এমনকি আগামী দশকেও প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নিচে থাকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের পূর্বাভাস: ২০২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান ও ক্রয়ক্ষমতা ক্রমাগত কমছে। আইএমএফ জানিয়েছে, ২০২৭ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১০ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে এবং ২০৩১ সালের আগে তা ৫ দশমিক ৫ শতাংশে নামার সম্ভাবনা নেই।
পাশাপাশি শ্রমবাজারে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। ২০২২ সালে নারীদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪২ দশমিক ৮ শতাংশ থাকলেও ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৪ শতাংশে। এছাড়া বিনিয়োগ মন্দার কারণে ২০২৬ অর্থবছরে মোট বিনিয়োগ ০ দশমিক ৫ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে বিশ্বব্যাংক।
অর্থনৈতিক এই শ্লথগতির বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের দারিদ্র্য সীমার ওপর। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং ২০২৮ অর্থবছরে ২২ দশমিক ৪ শতাংশ হতে পারে।
অন্যদিকে, সরকারের রাজস্ব আয় নিয়ে বড় শঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলতি দশকের শেষ পর্যন্ত রাজস্ব আয় জিডিপির মাত্র ৮ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে। অথচ সরকারের রাজস্বের বড় অংশই চলে যাচ্ছে ঋণ ও সুদ পরিশোধে। ২০২৫ অর্থবছরে মোট রাজস্বের ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ সুদ পরিশোধে ব্যয় হলেও, ২০৩১ অর্থবছরে তা প্রায় ৪০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এছাড়া আইএমএফের প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০৩১ সালের মধ্যে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার প্রায় ১৬০ টাকায় নেমে যেতে পারে।
দেশের ভঙ্গুর ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনে বিশাল অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হবে। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের হিসাব অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতকে টিকিয়ে রাখতে আগামী কয়েক বছর প্রতিবছর ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টার বরাত দিয়ে প্রায় ৪০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ের সম্ভাবনার কথাও নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে জ্যোতি রহমান কিছু সুনির্দিষ্ট সুপারিশ তুলে ধরেছেন:
ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতের স্বচ্ছ পুনর্গঠন পরিকল্পনা গ্রহণ।
সতর্কতামূলক রাজস্বনীতি প্রণয়ন ও কর আদায় বাড়ানো।
বিনিময় হার ব্যবস্থাপনায় ধারাবাহিকতা রক্ষা ও ভর্তুকি সংস্কার।
ঝুঁকিতে থাকা প্রান্তিক পরিবারগুলোর জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা।
তার মতে, শুধুমাত্র সাময়িক ঋণসহায়তা বা মুদ্রানীতি শিথিল করে এই বহুমুখী সংকট মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। সরকারের পক্ষ থেকে সংকটের বাস্তব চিত্র স্বীকার করে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে বাংলাদেশ দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থবিরতার মুখে পড়তে পারে।