রাষ্ট্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে নাগরিকমুখী করার ক্ষেত্রে আমাদের কর্তাব্যক্তিদের অনীহা যেন কাটছেই না। পুরোনো ভুলের পুনরাবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসার তাগিদ বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে। সম্প্রতি পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকিরের একটি মন্তব্য নতুন করে জনমনে আতঙ্ক এবং পুরোনো সহিংসতার ভীতি জাগিয়ে তুলেছে।
গত সোমবার রাজধানীর চকবাজারে ‘কমিউনিটি ইসলামিক ব্যাংক সিস্টেম’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির মন্তব্য করেন, “ক্রসফায়ার যদি প্রয়োজন হয়, সরকার যদি অ্যালাউ করে, আমরা সেটাই করব।”
নাগরিক সমাজের প্রশ্ন—সরকার চাইলেই কি বিচারবহির্ভূতভাবে কোনো নাগরিকের প্রাণ কেড়ে নেওয়া যায়? সংবিধানের ৩২ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে কাউকে বঞ্চিত করা যাবে না। জনগণের করের টাকায় বেতনভুক্ত একজন শীর্ষ কর্মকর্তার মুখে এমন বক্তব্য কেবল অসাংবিধানিকই নয়, বরং নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত অপমানজনক ও ভীতিকর।
যেখানে জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম মূল চেতনা ছিল মানুষের প্রাণের অধিকার নিশ্চিত করা, সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানের কাছ থেকে এমন মন্তব্য গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশ সংস্কারের উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।
আইজিপির বক্তব্যের পর পুলিশ সদর দপ্তর থেকে আত্মরক্ষার অধিকারের কথা বলে একটি ব্যাখ্যা দেওয়া হলেও অতীত অভিজ্ঞতা ভিন্ন কথা বলে। অতীতে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা হলেও গবেষণা ও তথ্যপ্রমাণ অন্য বাস্তবতাই তুলে ধরেছে।
গবেষণার তথ্য: সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডে র্যাবের (বর্তমানে এসআরবি) পাশাপাশি ডিবিসহ পুলিশ বাহিনীর সম্পৃক্ততা ছিল প্রায় ৪৮.০৫ শতাংশ, যা র্যাবের চেয়েও বেশি।
পুরস্কারের নজির: টেকনাফ থানার আলোচিত সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ ২০১৯ সালে ‘বাংলাদেশ পুলিশ পদক’ (বিপিএম) পেয়েছিলেন। পুলিশ সদর দপ্তরে জমা দেওয়া তাঁর কৃতিত্বপূর্ণ অবদানের সব কটি ঘটনাই ছিল আসামি নিহত হওয়ার ঘটনা বা তথাকথিত ‘বন্দুকযুদ্ধ’।
এ থেকেই প্রতীয়মান হয় যে, বাহিনীগতভাবে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডকে অনেক সময় অপরাধ হিসেবেই গণ্য করা হয় না।
পুলিশপ্রধানের এই বক্তব্যের পর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)সহ দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও সচেতন মহল তীব্র নিন্দা ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। টিআইবি এই বক্তব্যকে অত্যন্ত বিপজ্জনক বার্তা আখ্যা দিয়ে তা অবিলম্বে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে। সমালোচকদের মতে, বাহিনীর প্রধানের মনস্তত্ত্বে যদি এমন ঔপনিবেশিক ও প্রাণঘাতী মানসিকতা শিকড় গেড়ে থাকে, তবে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নিরপেক্ষ তদন্ত সোনার পাথর বাটিতে পরিণত হবে।
বিশ্বের বহু দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি বা আন্দোলন চলাকালীন সর্বাত্মক সংযম দেখানো হলেও আমাদের দেশে পুলিশপ্রধানের মুখেই সরাসরি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের প্রকাশ্য আকাঙ্ক্ষা শোনা গেল। অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে যখন পুলিশ বাহিনীকে একটি সম্পূর্ণ নাগরিকবান্ধব ও সেবামুখী প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করার সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছিল, তখন এই ধরনের বক্তব্য সেই অর্জনকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলে দিচ্ছে।