সরকারি প্রকল্পের অনিয়ম রোধে যেখানে কঠোর পদক্ষেপ কাম্য, সেখানে নিজের কেনা ব্যক্তিগত জিপ গাড়ি নিজের প্রকল্পেই ঠিকাদারের মাধ্যমে ভাড়ায় চালিয়ে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন মৎস্য অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা। গোপালগঞ্জের একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পে এই অভিনব জালিয়াতির ঘটনা ঘটলেও শাস্তি হিসেবে জুটেছে কেবল ‘তিরস্কার’।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে এই তথ্য জানা গেছে। অভিযুক্ত এস এম আশিকুর রহমান মৎস্য অধিদপ্তরের ‘দেশীয় প্রজাতির মাছ এবং শামুক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) হিসেবে দায়িত্বরত আছেন।
প্রকল্প দপ্তর সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালের জুলাইয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের আওতায় ১১টি ডাবল কেবিন পিকআপ ও প্রকল্প পরিচালকের জন্য জিপ কেনার কথা ছিল। তবে করোনাভাইরাস ও পরবর্তী অর্থনৈতিক সংকটে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকায় গাড়ি কেনা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর উন্মুক্ত দরপপত্রের মাধ্যমে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে গাড়ি সরবরাহের কাজ দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক এস এম আশিকুর রহমান তাঁর নিজের নামে নিবন্ধিত ব্যক্তিগত জিপটি (ঢাকা মেট্রো-ঘ-২২-১৪১৬) মাসিক ৫০ হাজার টাকা চুক্তিতে ওই সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছে ভাড়া দেন। এরপর নিয়ম ভেঙে আবার সেই গাড়িই ঠিকাদারের কাছ থেকে নিজের প্রকল্প ব্যবহারের জন্য ভাড়ায় নেন তিনি। মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে একে ‘সরবরাহকারীর সঙ্গে যোগসাজশ’ ও সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত বিধিমালার স্পষ্ট লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ঘটনায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮-এর ৩(খ) বিধির ৪(২)(ক) অনুযায়ী আশিকুরকে ‘অসদাচরণ’-এর দায়ে অভিযুক্ত করা হয় এবং লঘুদণ্ড স্বরূপ কেবল ‘তিরস্কার’ করা হয়। বর্তমানে তিনি স্বপদেই বহাল রয়েছেন এবং পুরোনো একটি পাজেরো গাড়ি ব্যবহার করছেন।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আশিকুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, ঠিকাদার গাড়ি দিতে কিছুটা গড়িমসি করায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, যা মাত্র ছয় মাসের জন্য করা হয়েছিল।
তবে ঘটনাটিকে খুব বড় করে দেখতে নারাজ মৎস্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক আনিছুর রহমান তালুকদার। তিনি বলেন, গাড়িটি যদি নিজের নামে না রেখে স্ত্রী বা অন্য কারও নামে নিবন্ধন করা হতো, তবে হয়তো এই জটিলতা তৈরি হতো না। পিডি হয়ে নিজের প্রকল্পেই গাড়ি ভাড়া দেওয়ায় তাঁকে এই তিরস্কার পেতে হয়েছে।
ঢাকা, বরিশাল ও খুলনা বিভাগের ১০টি জেলার ৪৯টি উপজেলায় ২০৭ কোটি ৯৮ লাখ টাকা ব্যয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হচ্ছে। উন্মুক্ত জলাশয়ে মৎস্য অভয়ারণ্য তৈরি, দরিদ্র মৎস্যজীবীদের বিকল্প কর্মসংস্থান এবং দেশি প্রজাতির মাছ ও শামুক সংরক্ষণের মতো জনগুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পটি চলতি বছরের জুনে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও সময় ও ব্যয় দুটোই বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশীয় প্রজাতির মাছ ও শামুক রক্ষায় এই উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী হলেও এমন অনিয়ম ও লঘুদণ্ডের সংস্কৃতি প্রকল্পের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।