স্বাস্থ্যসেবার এক অন্তহীন অব্যবস্থাপনা ও বাস্তব চিত্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রয়েছে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ (কুমেক) হাসপাতাল। যেখানে দেশের প্রান্তিক ও দূর-দূরান্ত থেকে প্রতিদিন ছুটে আসছেন হাজারো অসুস্থ মানুষ, সেখানে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা আর জনবলসংকটের কারণে এক চরম মানবিক সংকটের আবর্তে দিন কাটছে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের।
পরিসংখ্যান যা বলছে: শয্যা ৫০০, রোগী ১,৪০৩!
হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অনুমোদিত শয্যাসংখ্যা মাত্র ৫০০। অথচ সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, গত ২৮ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এই হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ছিল ১,৪০৩ জন। অর্থাৎ, নির্ধারিত ক্ষমতার চেয়ে ৯০৩ জন অতিরিক্ত রোগী বা প্রায় তিন গুণেরও বেশি চাপের মুখোমুখি হতে হয়েছে হাসপাতালটিকে।
সীমাহীন চাপে ভেঙে পড়ছে স্বাস্থ্যসেবা
৫০০ জন রোগীর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার জন্য যে অবকাঠামো ও জনবল বরাদ্দ রয়েছে, তার তিন গুণ চাপ সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীরা। হাসপাতালের মেঝেতে, বারান্দায় কিংবা তিল ধারণের ঠাঁই নেই এমন ওয়ার্ডগুলোতে চলছে চিকিৎসা।
একদিকে অসুস্থ রোগীদের দীর্ঘশ্বাস, স্বজনদের উৎকণ্ঠা আর দ্রুত সুস্থ করে তোলার ব্যাকুলতা; অন্যদিকে সীমিত জনবল, অপ্রতুল সুযোগ-সুবিধা এবং বিরামহীন ডিউটির ক্লান্তিকর বোঝা। এই দুইয়ের যাতাকলে পিষ্ট হয়ে পড়ছে পুরো স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা।
চিকিৎসকরা মানুষ, কোনো যন্ত্র নন
সংকটময় এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে—চিকিৎসকদের এই সীমাহীন পরিশ্রম ও ত্যাগের মূল্যায়ন কোথায়?
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চিকিৎসকরাও রক্ত-মাংসের মানুষ, কোনো যন্ত্র নন। দিনরাত একটানা কাজ করতে গিয়ে তাদেরও শারীরিক ও মানসিক অবসাদ আসছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিরাপত্তা এবং একটি অনুকূল কর্মপরিবেশ ছাড়া তারা কীভাবে শতভাগ সেবা নিশ্চিত করবেন? রোগীর জীবন বাঁচানোর পবিত্র দায়িত্বে নিয়োজিত থেকে চিকিৎসকরা নিজে যখন এই অব্যবস্থাপনার শিকার হন, তখন তা পুরো ব্যবস্থার জন্যই এক বড় লজ্জার বিষয়।
সমাধান কোন পথে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, ১,৪০৩ জন রোগীর বিপরীতে ৫০০ শয্যার এই চিত্রটি কেবল একটি হাসপাতালের নয়; বরং এটি আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চেপে বসা প্রচণ্ড চাপের একটি জ্বলন্ত প্রতিচ্ছবি। এই সংকটের দায় এককভাবে কোনো চিকিৎসক বা হাসপাতালের ওপর চাপানো যায় না।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে যা প্রয়োজন:
শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি
হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ও শয্যাসংখ্যা বর্তমান রোগীর চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দ্রুত বৃদ্ধি করা।
জনবল নিয়োগ
পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও সহায়ক কর্মী নিয়োগের মাধ্যমে কাজের চাপ কমানো।
অবকাঠামোগত উন্নয়ন
আধুনিক চিকিৎসাসামগ্রী ও লজিস্টিক সাপোর্ট নিশ্চিত করা।
নিরাপত্তা ও কর্মপরিবেশ
চিকিৎসকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং মানবিক কাজের সময়সীমা নির্ধারণ করা।
সময় এসেছে মানবিক হওয়ার
সাধারণ মানুষ চিকিৎসকদের কাছে সবসময় সর্বোচ্চ মানবিক আচরণ ও সেবা প্রত্যাশা করেন। তবে চিকিৎসকদের সুরক্ষায় এবং তাদের শ্রমের মূল্যায়নে সমাজ ও রাষ্ট্রকেও সমপরিমাণ মানবিক ও দায়িত্বশীল হতে হবে।
রোগী বাঁচানোর এই কঠিন লড়াইয়ে চিকিৎসক যেন নিজে ব্যবস্থার অবহেলার শিকার না হন। রোগী ও চিকিৎসক—উভয়ের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত হলেই কেবল একটি টেকসই ও মানবিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠা সম্ভব। চিকিৎসকদের কষ্ট অনুধাবন করে তাদের পাশে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি, কারণ একটি সুস্থ স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে চিকিৎসকদের সুস্থ ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের কোনো বিকল্প নেই।