গাজীপুরের রাজেন্দ্রপুর ডাকবাংলোয় সময় কাটানোর নামে সড়ক বিভাগের বিভিন্ন স্তরের প্রকৌশলীদের বদলি বাণিজ্যে, পূর্বপরিকল্পিত পদায়ন তালিকা তৈরি ও বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেনের তথ্য মিলেছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব ড. মোহাম্মদ জিয়াউল হক ডাকবাংলোর এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে বদলি বাণিজ্যে, পদায়ন তালিকা তৈরি ও অর্থের লেনদেনের মূলহোতা ছিলেন তিনি। গত ২২ আগস্ট সড়ক পরিদর্শনের নামে গাজীপুরের আয়োজিত ওই ডাকবাংলোয় উপস্থিত ছিলেন সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা ছাড়াও শিক্ষা ও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট উইংয়ের একাধিক কর্মকর্তা।
ডাকবাংলোয় বসেই পুরো সড়ক বিভাগের বদলি ও পদায়নের একটি তালিকা তৈরি করা হয় এবং সেই অনুযায়ী পরদিনই বদলি-পদায়নের আদেশ জারি করা হয়। এই বদলি প্রক্রিয়ায় বিপুল অঙ্কের অর্থের লেনদেন হয়, যার একটি অংশ ঘটনাস্থলেই নগদে সম্পন্ন হয়। তবে বড় অঙ্কের লেনদেনগুলো হয় ‘ক্যাশ চেক’ এবং মৌখিক অঙ্গীকারের ভিত্তিতে।
নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার অনুসন্ধানেও এসব ঘটনার সত্যতা উদঘাটিত হয়েছে। এই বিষয়ে সড়ক সচিব ড. মো. জিয়াউল হকের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি ঘটনার সত্যতা অস্বীকার করতে পারেননি, আবার কোনো সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যাও দিতে পারেননি।
এ ঘটনার পরপরই সড়ক সচিব জিয়াউল হকের স্ত্রী ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য পদ থেকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে পদায়ন পান। ডাম্পিং পদে থাকা এই কর্মকর্তাকে হঠাৎ গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করাকে কেন্দ্র করে নানা গুঞ্জন তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি বিমান মন্ত্রণালয়ের অধীনে বড় বড় কেনাকাটা, বিমানবন্দর নির্মাণসহ বিভিন্ন বড় বিনিয়োগ ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যয়ের মৌসুম চলছে। ঠিক এই সময়েই নূরুন্নাহার চৌধুরীর এ পদায়নকে অনেকেই স্বামীর ‘বদলি বাণিজ্যের পারফরম্যান্সে’র পুরস্কার হিসেবে দেখছেন।
ড. নুরুন্নাহার চৌধুরীকে বিগত বিএনপি সরকারের আমলেই একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় (নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়) থেকে সরিয়ে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য পদে পদায়ন করা হয়েছিল। সচিব হিসেবে আশানুরূপ পারফরম্যান্স না দেখানো এবং দুর্নীতির অভিযোগ ওঠায় তাকে ডাম্পিং পদে পাঠানো হয়। তা সত্ত্বেও কোনো সুনির্দিষ্ট কারণ ছাড়াই হঠাৎ একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে বিমানে সচিবের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানো নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা যায়, রাজেন্দ্রপুর ডাকবাংলোয় যে লেনদেন হয়েছে, তার একটি ক্ষুদ্র অংশ পেয়েছেন সড়ক সচিব এবং তার বিশ্বস্ত উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তবে সিংহভাগ অর্থই চলে গেছে নেপথ্যের একটি প্রভাবশালী মহলের কাছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, বদলি বাণিজ্যের বড় অঙ্ক পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েই সেই প্রভাবশালী মহলটি সচিবের স্ত্রীকে বিমানে পদায়নের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। অথচ ড. জিয়াউল হক এবং তার স্ত্রী নূরুন্নাহার চৌধুরী উভয়কেই আগের সরকারের ঘনিষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর তারা সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের তোপের মুখেও পড়েছিলেন। তাছাড়া নূরুন্নাহার চৌধুরী বহুল আলোচিত সায়লা ফারজানার ‘মায়াবতী’ গ্রুপের অন্যতম সদস্য এবং জিয়াউল হক তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠ অর্থ সমন্বয়ক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। এ অবস্থায় বর্তমান প্রশাসনেও জিয়াউল হক কার স্বার্থ রক্ষায় কাজ করছেন, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
প্রকাশিত এসব প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে ড. মো. জিয়াউল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নিজের অতীত ও বর্তমান কাজের সাফাই দেওয়ার চেষ্টা করেন। নিজেকে একজন মেধাবী, সাবেক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক এবং সৎ কর্মকর্তা দাবি করে তিনি এসব অভিযোগ এড়ানোর চেষ্টা করেন।