Dhaka ০৫:১৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
তৃণমূল থেকে বিকেএসপি ও ৪৬০০ মাঠ তৈরির বড় পরিকল্পনা: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক গাজীপুরে বেতন বৃদ্ধির দাবিতে চন্দ্রায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়ক অবরোধ করে শ্রমিকদের বিক্ষোভ বরিশাল বোর্ডে এইচএসসিতে বড় পতন: পাসের হার ৪৪.৮৪%, শীর্ষে পিরোজপুর বিএমডিএতে রাজশাহী সার্কেলের অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা: জ্যেষ্ঠতা বনাম প্রশাসনিক স্বচ্ছতার প্রশ্ন শাহজালাল বিমানবন্দরে পদ্মা অয়েলের এভিয়েশন বিভাগে তেল চুরির সিন্ডিকেট: ২১ বছর ধরে একই পদে হামিদুল্লাহ সাদেক! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে বিএনপির উপদেষ্টা ফজলুর রহমানের কড়া সমালোচনা ইউরোপকে কড়া বার্তা রেজারির: ‘যুদ্ধাপরাধের চড়া মূল্য আপনাদেরই চুকাতে হবে’ মাধবপুরে ওয়ারেন্টভুক্ত মামলায় শ্রমিক লীগ নেতা গ্রেপ্তার গোপালগঞ্জে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় চালক নিহত সৌদির অগ্নিকাণ্ডে নিহত আরও ৭ বাংলাদেশির মরদেহ দেশে

মহাকাব্যের শেষ অধ্যায়: আকাশি-সাদা জার্সিতে লালিত স্বপ্নের বিদায়

  • অনলাইন ডেস্ক
  • আপডেট টাইম : ১২:০০:৩৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ অক্টোবর ২০২৬
  • ১৪ বার

খেলার শেষ বাঁশিটি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠের চিত্রটা বদলে যায় এক অদ্ভুত মানবিক উপাখ্যানে। লিওনেল মেসির সতীর্থদের অশ্রুসিক্ত চোখ আর বুকচাপা হাহাকার পুরো স্টেডিয়ামে যেন এক শোকের ছায়া ফেলে দিয়েছিল। একদিকে বিজয়ী পক্ষের বিজয়োল্লাস, অন্যদিকে পরাজিত দলের সমর্থকদের ভালোবাসার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ—দুইয়ের মিশেলে তৈরি হয়েছিল এক থমথমে পরিবেশ। কিন্তু এই সমবেত উত্তেজনার মাঝেও লিওনেল মেসির স্থির দৃষ্টি আটকে ছিল গ্যালারির সেই বিশেষ কোণে, যেখানে ভিড় করেছিলেন তাঁর ভালোবাসার স্বদেশবাসীরা।

পুরস্কার বিতরণের মঞ্চ থেকে ক্ষোভে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার যে গুঞ্জন রটেছিল, তার সত্যতা ছিল না বললেই চলে। অ্যালবিসেলেস্তেদের হৃদস্পন্দন এই তারকা আসলে চেষ্টা করছিলেন সেই অনন্য মুহূর্তের প্রতিটি অনুভূতি, প্রতিটি ধ্বনি নিজের অন্তরে চিরতরে খোদাই করে নিতে। তিনি অনুধাবন করছিলেন, আগামী দিনে ফেলে আসা দিনগুলোকে যখনই তিনি মনে করবেন, এই স্মৃতিগুলোই হবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সঞ্চয়। ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালের ট্র্যাজেডি তাঁকে মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছিল ঠিকই, তবে তাঁর এই অঝোর ধারায় কাঁদার নেপথ্যে ছিল গভীর এক সত্য—আকাশি-সাদা পোশাকে এটাই যে ছিল দেশের হয়ে তাঁর শেষ লড়াই।

মেসির জীবনের গল্পটা মূলত একজন প্রবাসীর, যিনি শৈশবেই উন্নত জীবন আর স্বপ্নের খোঁজে ভিটেমাটি ছেড়েছিলেন—যেমনটা বিশ্বের লাখ লাখ মানুষকে করতে হয়। কিন্তু ভিনদেশে কেটে গেলেও নিজের মূল ও শেকড়কে তিনি কোনোদিন ভুলে যাননি। ফুটবল ক্যারিয়ারের শুরুতে স্পেনের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ তাঁর সামনে উন্মুক্তই ছিল, আর সেই পথ বেছে নিলে হয়তো তাঁর ক্যাবিনেটে যোগ হতো আরও কয়েকটি বিশ্বকাপের সোনালী ট্রফি। কিন্তু নিজ দেশের প্রতি আনুগত্যকে তিনি কখনোই বিকিয়ে দেননি। বিশাল ফুটবলীয় দক্ষতার বাইরে তাঁর এই আত্মমর্যাদা ও বিনয়ই তাঁকে লাতিন আমেরিকার এক অনন্য প্রতীকে পরিণত করেছে।

শৈশবে রোసారిওতে কাটানো প্রথম ১৩টি বছর এবং গ্রোথ হরমোনের বিরল দূরারোগ্য ব্যাধির সাথে লড়াইয়ের গল্প আজ সবার জানা। চিকিৎসাসংক্রান্ত সেই বিশাল অর্থনৈতিক সংকট যখন তাঁর পরিবার বা স্থানীয় ক্লাবের সাধ্যের বাইরে চলে যায়, ঠিক তখনই দেবদূতের মতো এগিয়ে এসেছিল বার্সেলোনা। তৎকালীন আর্জেন্টিনার অর্থনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে নতুন এক জীবনের খোঁজে দেশ ছাড়ার বিমান ধরাটাই ছিল তাঁর জন্য একমাত্র বাস্তবসম্মত পথ।

বার্সার যুব দলে যোগ দেওয়ার পর থেকেই তাঁর অসাধারণ প্রতিভা নজর কাড়তে শুরু করে। স্বভাবতই স্প্যানিশ ফুটবল ফেডারেশন তাঁকে নিজেদের দলে ভেড়াতে মরিয়া হয়ে ওঠে। তবে মেসি ও তাঁর পরিবারের মনে স্পন্দিত হতো কেবলই আর্জেন্টিনার নাম। অত্যন্ত অল্প বয়সে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারেও তিনি দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে জানিয়েছিলেন, আর্জেন্টিনার জ্যেষ্ঠ দলের প্রতিনিধিত্ব করাই তাঁর একমাত্র স্বপ্ন। বিষয়টি বুঝতে পেরে আর্জেন্টিনা ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন দ্রুত পদক্ষেপ নেয় এবং ২০০৪ সালের জুনে অনূর্ধ্ব-২০ দলের এক প্রীতি ম্যাচে তাঁকে নামিয়ে চিরতরে দেশের জার্সিতে নিজেদের করে নেয়।

তবে আন্তর্জাতিক ফুটবলের মূল মঞ্চে তাঁর সূচনাটি কাব্যিক হলেও ছিল ভীষণ কন্টকাকীর্ণ। ২০০৫ সালের আগস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে জ্যেষ্ঠ জাতীয় দলে যখন তাঁর অভিষেক হয়, বদলি হিসেবে মাঠে নামার মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মাথায় লাল কার্ড দেখে তাঁকে মাঠ ছাড়তে হয়। এই নাটকীয় আর অনাকাঙ্ক্ষিত শুরুটাই যেন বলে দিচ্ছিল, জাতীয় দলের হয়ে তাঁর ভবিষ্যতের পথটি মোটেও গোলাপ বিছানো হবে না।

আর্জেন্টাইন ফুটবলের ঘোর অমানিশার দিনে মেসির আবির্ভাব ঘটেছিল এক ‘নতুন ম্যারাডোনা’র রূপ নিয়ে। বাঁ পায়ের জাদু, ১০ নম্বর জার্সি আর ড্রিবলিংয়ের মিল থাকার কারণে ম্যারাডোনার সাথে তাঁর তুলনাটা যেমন ছিল অনিবার্য, তেমনই তরুণ মেসির কাঁধে তা চাপিয়ে দিয়েছিল হিমালয়সম পাহাড়ের চাপ। বার্সেলোনাকে একের পর এক ট্রফি জেতানো মেসি যখন জাতীয় দলের হয়ে কোনো শিরোপা জিততে পারছিলেন না, তখন নিজ দেশেই তাঁর জাতীয়তাবাদ ও আনুগত্য নিয়ে উঠতে শুরু করে নানা কটূক্তি। এমনকি ‘জাতীয় সংগীত না গাওয়া’র মতো তুচ্ছ বিষয়েও তাঁকে বিদ্ধ করা হতো।

এরপর আসে ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপের ফাইনাল এবং পরবর্তী দুটি কোপা আমেরিকার ফাইনালে হারের ট্র্যাজেডি। টানা তিন ফাইনালে হেরে চূর্ণবিচূর্ণ মেসি ২০১৬ সালে আবেগপ্রবণ হয়ে অবসর ঘোষণা করে বলেছিলেন, “আমি চেষ্টা করেছি, কিন্তু এই অর্জন হয়তো আমার ভাগ্যে নেই।” তবে পরাজয়কে শেষ কথা হতে না দিয়ে একজন প্রকৃত যোদ্ধার মতো তিনি ফের মাঠে ফিরে আসেন।

২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপের হতাশা কাটিয়ে ২০১৯ সালে এক সাক্ষাৎকারে মেসি তাঁর জীবনের অন্যতম সেরা বার্তাটি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “আমি অন্তত শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করার তৃপ্তি নিয়ে বিদায় নিতে চাই। কেবল ফুটবলের জন্য নয়, এটি জীবনের জন্য—হোঁচট খেয়ে আবার উঠে দাঁড়ানো এবং স্বপ্নের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার নামই জীবন।”

দীর্ঘ ১৬ বছরের প্রতীক্ষার পর ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় মেসির ওপর থেকে সমস্ত মনস্তাত্ত্বিক শেকল ভেঙে দেয়। যার চূড়ান্ত পরিণতি আসে ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে মহাকাব্যিক ট্রফি জয়ের মাধ্যমে। ৩৮ বছর বয়সে নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপেও তিনি দেখিয়েছেন কেন তিনি অনন্য। এবার যদিও ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে শরীরের ক্লান্তি তাঁকে সেরাটা দিতে দেয়নি, তবুও এই টুর্নামেন্টের পর ফুটবল বিশ্ব এক বাক্যে মেনে নিয়েছে—লিওনেল মেসিই সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ।

বেনিনের বিপক্ষে বিদায় কিংবা ৩৯ বছর বয়সে এসে শারীরিক সীমার মুখোমুখি হওয়া—মেসির এই বিদায় ছিল যেমন স্বাভাবিক, তেমনই ফুটবলপ্রেমীদের জন্য পরম বেদনার। ইন্টার মিয়ামির হয়ে তাঁর শেষ দিনগুলোর ফুটবল হয়তো এখনো দেখা যাচ্ছে, কিন্তু আন্তর্জাতিক ফুটবলের এক রূপকথার অধ্যায়ের যে পরিসমাপ্তি ঘটল, তা আর কখনো ফিরে আসবে না। রজার ফেদেরার বা মাইকেল জর্ডানের মতোই মেসি ছিলেন আকাশের সেই বিরল ধূমকেতু, যা প্রজন্মে কেবল একবারই দেখা যায়।

নিজের বিদায়ী বার্তায় এই মহাতারকার সেই চিরন্তন বাক্যটিই থেকে যায়: “আমাকে আর্জেন্টাইন হিসেবে সৃষ্টি করার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ।” দেশপ্রেম কোনো ভৌগোলিক অবস্থানের ওপর নির্ভর করে না, তা থাকে মানুষের গভীরে—আর লিওনেল মেসি তাঁর সত্তার প্রতিটি কণিকায় চিরকাল একজন গর্বিত আর্জেন্টাইন।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোচিত

তৃণমূল থেকে বিকেএসপি ও ৪৬০০ মাঠ তৈরির বড় পরিকল্পনা: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক