
১৯৯৭ সাল। লন্ডনে পাকিস্তানের ৫০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এক অনুষ্ঠান। আমন্ত্রিত অতিথিদের ভিড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন এক হলিউড অভিনেতা, যাকে বিশ্ব চেনে রক্তচোষা ‘ড্রাকুলা’ কিংবা জেমস বন্ডের ধূর্ত খলনায়ক ‘স্কারামাঙ্গা’ হিসেবে—নাম তাঁর ক্রিস্টোফার লি। সেখানে হুট করেই দুই ব্যক্তি এসে তাকে প্রশ্ন করলেন, “মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ সম্পর্কে আপনার ধারণা কী?”
উত্তরে লি বললেন, “তিনি প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর দৃঢ়সংকল্পের এমন এক ব্যক্তি, যিনি পাকিস্তান নামের একটি সম্পূর্ণ নতুন রাষ্ট্র তৈরি করেছিলেন।”
কথা শুনে ক্ষণিকের নীরবতা, আর তারপরেই এলো সেই ঐতিহাসিক প্রস্তাব— “আমরা চাই, আপনি জিন্নাহর চরিত্রে অভিনয় করুন।”
প্রস্তাবটি যেমন বিস্ময়কর ছিল, তেমনি এরপরের পথচলাও ছিল বিতর্কের ঝড়ে ঘেরা। চলচ্চিত্র নির্মাতা জামিল দেহলভি এবং গবেষক-প্রযোজক ড. আকবর এস আহমেদের যৌথ প্রযোজনায় ১৯৯৮ সালে মুক্তি পায় যুক্তরাজ্য ও পাকিস্তানের এই যৌথ ড্রামা ফ্লিম ‘জিন্নাহ’। তবে এর রূপালী পর্দার পেছনের ইতিহাসও যেকোনো চলচ্চিত্রের নাটకీయতাকে হার মানায়।
বিতর্কের ঝড় ও করাচির দিনগুলি
এক একজন খ্রিষ্টান ও পশ্চিমা অভিনেতা—যিনি পর্দায় ড্রাকুলার মতো হিংস্র চরিত্রে খ্যাতি কুড়িয়েছেন—তিনি কীভাবে মুসলিম রাষ্ট্র পাকিস্তানের জাতির পিতার চরিত্রে অভিনয় করবেন? সিনেমা নির্মাণের ঘোষণা আসতেই গর্জে উঠেছিল পাকিস্তানের তৎকালীন সংবাদপত্রগুলো।
তবে সমালোচনা সামলে প্রায় ১০ সপ্তাহের জন্য করাচি পৌঁছান ক্রিস্টোফার লি। হোটেলে পা রাখতেই লির আসার খবর ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে। একদিকে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ফারুক আহমেদ খান লঘারির স্বাগত চিঠি, অন্যদিকে করাচির রাজপথে লির পরিবার ঘিরে কড়া নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ছিল উত্তপ্ত। সমস্ত বিতর্ক প্রসঙ্গে লির সহজ বক্তব্য ছিল, “অভিনেতা তার অভিনীত চরিত্র থেকে আলাদা। অতীতের খল চরিত্রগুলো জিন্নাহর মতো নেতার ভূমিকার পথে বাধা হতে পারে না।”
স্বর্গীয় গ্রন্থাগার ও ইসলামী বিশ্বাস
চিত্রনাট্যেও একাধিক পরিবর্তন আনতে হয়েছিল। শুরুতে ভাবা হয়েছিল, সিনেমাটি শুরু হবে ‘লিম্বো’ বা পরলোকের এক মধ্যবর্তী স্থানে, যেখানে একজন ফেরেশতার সামনে জিন্নাহ তার জীবনের হিসাব দিচ্ছেন। কিন্তু ইসলামী বিশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় সেই ভাবনা বাদ দিয়ে পর্দায় আনা হয় এক কাল্পনিক ‘স্বর্গীয় গ্রন্থাগার’। ভারতীয় কিংবদন্তি অভিনেতা শশী কাপুর সেই গ্রন্থাগারের প্রধানের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, যিনি জিন্নাহকে ঘুরিয়ে দেখান সাধারণ এক নেতা থেকে তাঁর ‘কায়েদে আজম’ হয়ে ওঠার পেছনের অলিগলি।
জিন্নাহর হাঁটা, কাশি ও বাস্তবের অশ্রু
চরিত্রটিকে নিখুঁত করতে লির প্রস্তুতির কোনো কমতি ছিল না। জিন্নাহর পুরোনো ভিডিও ও বেতার বক্তৃতা থেকে তিনি রপ্ত করেছিলেন এই নেতার হাঁটার ধরণ, হাতের অঙ্গভঙ্গি, কথা বলার সুর, এমনকি কাশির ভঙ্গিটুকুও! লাহোরে ঐতিহাসিক ভাষণের জায়গায় দাঁড়িয়ে অভিনয় করার সময় এবং জিন্নাহর সমাধিসৌধে যাওয়ার পর লি উপলব্ধি করেন এই পোট্রেয়ালের ভারী দায়িত্ব।
দেশভাগের এক শরণার্থী কাফেলার দৃশ্যে একটি ছোট্ট শিশু যখন মাকে হারায়, তখন ক্যামেরার সামনে হলিউডের এই দামি অভিনেতার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়েছিল সত্যিকরের অশ্রু জল।
পর্দার পেছনের সংকট ও আন্তর্জাতিক সাফল্য
প্রচণ্ড গরম, নিরাপত্তা বলয়, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং শুটিং চলাকালেই পাকিস্তানে রাজনৈতিক পরিবর্তনের কারণে অর্থ সংকট—সব মিলিয়ে নির্মাণ কাজ মোটেও সহজ ছিল না। আন্তর্জাতিক সংস্করণে লির নিজস্ব কণ্ঠ থাকলেও উর্দু সংস্করণে তার কণ্ঠ ডাবিং করেন বিখ্যাত পাকিস্তানি অভিনেতা গোলাম মহিউদ্দিন। এছাড়াও জিন্নাহর বোন ফাতেমা জিন্নাহর চরিত্রে শিরিন শাহ, তরুণ জিন্নাহর চরিত্রে রিচার্ড লিন্টার্ন, মহাত্মা গান্ধীর চরিত্রে স্যাম দস্তর, নেহেরুর চরিত্রে রবার্ট অ্যাশবি এবং লর্ড মাউন্টব্যাটেনের চরিত্রে জেমস ফক্স অনন্য অভিনয় উপহার দেন।
নিউইয়র্ক, লস অ্যাঞ্জেলেস, লন্ডন ও কায়রোর মতো বড় বড় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রশংসিত হলেও পাকিস্তানের বাইরে কোনো বড় ডিস্ট্রিবিউটর পায়নি ছবিটি।
তবে বিশ্বজোড়া স্বীকৃতি কিংবা অর্থসংকটের চেয়েও লির স্মৃতিতে আজীবন অমর হয়ে থেকে গিয়েছিল সাধারণ পাকিস্তানি অধিবাসীদের প্রতিক্রিয়া। নিজের স্মৃতিকথা ‘লর্ড অব মিসরুল’-এ লি লিখেছেন—স্থানীয় দোকানদার, সেনা ও পুলিশ সদস্য থেকে শুরু করে সহ-শিল্পীরা যখন শেষ দিনে তার দিকে তাকিয়ে শুধু একটি শব্দ উচ্চারণ করেছিলেন, তখন তিনি বুঝেছিলেন তিনি সফল।
সেই শব্দটি ছিল কেবল— ‘ধন্যবাদ’।
অনলাইন ডেস্ক 

























