
কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন সোহাগের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ গ্রহণ, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও জুয়া পরিচালনার মতো গুরুতর একাধিক অভিযোগ উঠেছে। জন্মনিবন্ধন সংশোধন, টিসিবির আবেদন তদন্ত, গ্রাম পুলিশের প্রশিক্ষণ তহবিল এবং পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগে অনিয়মের মাধ্যমে তিনি একচ্ছত্র অনিয়মের সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা ও ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ রয়েছে, গত ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি গ্রাম পুলিশদের কর্মদক্ষতা উন্নয়নবিষয়ক প্রশিক্ষণের নামে ছয়টি ইউনিয়ন থেকে ৮০ হাজার টাকা করে মোট ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা তোলা হয়। অথচ প্রশিক্ষণ নেওয়া ৪৩ জন গ্রাম পুলিশকে যাতায়াত ও ভাতা বাবদ জনপ্রতি মাত্র ১ হাজার ৪০০ টাকা করে মোট ৬০ হাজার ২০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। বাকি ৪ লাখ ১৯ হাজার ৮০০ টাকার কোনো সদুত্তর বা হিসাব দিতে পারেননি এই কর্মকর্তা।
সম্পত্তি হস্তান্তর করের ১ শতাংশ খাত থেকে ছয়টি ইউনিয়নে প্রায় ১০ কোটি টাকা বরাদ্দের ক্ষেত্রে ৪ শতাংশ কমিশন বা ঘুষ দাবির অভিযোগ উঠেছে সোহাগের বিরুদ্ধে। নির্দিষ্ট হারে কমিশন না দেওয়ায় সংশ্লিষ্ট ইউনিয়নগুলোর অর্থ ছাড়ের প্রক্রিয়া বর্তমানে আটকে রয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলায় টিসিবির পণ্যপ্রাপ্তির প্রায় ১৬০টি আবেদন যাচাই-বাছাই ও তদন্তের নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অফিস খরচের কথা বলে ২০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
জন্মনিবন্ধন অনুমোদন ও বয়স সংশোধনের মতো জরুরি নাগরিক সেবাকে বাণিজ্যে রূপান্তর করেছেন এই কর্মকর্তা। ইউনিয়ন সচিব, হিসাব সহকারী ও উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে প্রতিদিন জন্মনিবন্ধন বাবদ ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত অবৈধ লেনদেন পরিচালিত হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
কুমিল্লা টাউন হল সংলগ্ন কুমিল্লা মিনিস্টেরিয়াল অফিসার্স ক্লাবে মাহবুব নামের এক ব্যক্তির মাধ্যমে নিয়মিত জুয়ার আসর পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে সোহাগের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ওই আসর থেকে তিনি প্রতিদিন ৫ হাজার টাকা পান এবং সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নিজে সেখানে জুয়া খেলেন। ক্লাবের ভেতরে তাঁর জন্য একটি বিশেষ শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ বরাদ্দ রয়েছে বলেও জানা যায়। ক্লাবের আড্ডায় মগ্ন থাকায় তিনি নিয়মিত অফিস করেন না এবং দুপুর গড়িয়ে অফিসে পৌঁছান বলে অভিযোগ রয়েছে।
চলতি বছরের আগস্ট মাসে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে রানি হরিজনের মেয়ে রাশিকে কোনো ধরনের প্রকাশ্য বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা সোহাগের প্রত্যক্ষ তদবিরে মাসিক ১৪ হাজার টাকা বেতনে এই নিয়োগ দেওয়া হয়, যেখানে কার্যালয়ে পূর্বে থেকেই পর্যাপ্ত জনবল কর্মরত ছিল।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে খাগড়াছড়ি জেলা প্রশাসনে চাকরিতে যোগদানের পর ২০১৭ সালে কুমিল্লার ভুয়া বা অসংগতিপূর্ণ ঠিকানা ব্যবহার করে কুমিল্লার জেলা প্রশাসনে বদলি হয়ে আসেন মো. আমির হোসেন সোহাগ। তাঁর এই বদলির নথিপত্র ও সরকারি রেকর্ড যাচাইয়ের জোরালো দাবি উঠেছে।
বর্তমান কুমিল্লা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সজীব তালুকদার জানান, ‘আপনি যে অভিযোগগুলো উপস্থাপন করেছেন, এগুলো আমি এই উপজেলা অফিসে যোগদান করার আগের বিষয়। আমি আসার আগে কী হয়েছে, তা আমার জানা নেই। তবে আমি যোগদানের পর থেকে অত্যন্ত স্বচ্ছতার সাথে সকল কার্যক্রম পরিচালনা করার চেষ্টা করছি।’
এদিকে অভিযুক্ত উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. আমির হোসেন সোহাগের বক্তব্য জানতে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
জনস্বার্থবিরোধী এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের উর্ধ্বতন মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা।
অনলাইন ডেস্ক 




















