
রাজধানীর উত্তরার আব্দুল্লাহপুর বাসস্ট্যান্ডসংলগ্ন ‘হোটেল পালকি’-তে অনুসন্ধানী তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে হোটেল কর্তৃপক্ষের ইন্ধনে হামলার শিকার হয়েছেন সাংবাদিক রবিউল ইসলাম ও তাঁর সহকর্মী মাসুদ রানা। এ সময় তাঁদের ওপর শারীরিক নির্যাতন চালানো ছাড়াও মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে তথ্য মুছে ফেলা, প্রাণনাশের হুমকি এবং জোরপূর্বক সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
গত রোববার (১৮ অক্টোবর) আনুমানিক সন্ধ্যা ৬টার দিকে এ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে।
সাংবাদিকদের সূত্রে জানা যায়, হোটেলটির ভেতরে অনৈতিক কার্যক্রম, মাদক চোরাচালান এবং অবৈধ মুদ্রা ব্যবসায়ীদের গোপন বৈঠক চলছে—এমন গোপন সংবাদ পেয়ে সত্যতা যাচাইয়ের জন্য হোটেলটিতে প্রবেশ করেন সাংবাদিক রবিউল ইসলাম ও মাসুদ রানা।
তাঁরা হোটেলের ম্যানেজারের ডেস্কের সামনে পৌঁছানোর আগেই হোটেলকর্মীরা তাঁদের ঘিরে ধরে জেরা শুরু করেন এবং ভিডিও ধারণের মিথ্যা অভিযোগ তোলেন। রবিউল ইসলাম ভিডিও ধারণের বিষয়টি অস্বীকার করে তথ্য সংগ্রহ ও বক্তব্য নিতে আসার কথা বললেও উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে হোটেলের এক দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি বাইরে থেকে ৭-৮ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে ডেকে এনে হোটেলের গ্লাস ও গেট বন্ধ করে অতর্কিত হামলা চালান। সহকর্মীকে বাঁচাতে গিয়ে মাসুদ রানাও আঘাতপ্রাপ্ত হন।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, হামলাকারীরা জোরাজুরি করে রবিউল ইসলামের দুটি মোবাইল ফোন কেড়ে নেন এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে তা খুলতে বাধ্য করেন। পরে ফোন থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য-উপাত্ত ও ছবি মুছে ফেলা হয়। পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে তাঁদের বিরুদ্ধে চাঁদা দাবির মিথ্যা অভিযোগ তোলার চেষ্টা করা হয় এবং একটি টাকার বান্ডিল সামনে রেখে জোরপূর্বক ভিডিও ধারণ করা হয়।
সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হয়ে হামলাকারীরা রবিউল ইসলামকে ‘ভুয়া সাংবাদিক’ বলে গালিগালাজ করেন। ভবিষ্যতে ওই এলাকায় দেখলে হাড়-মাংস আলাদা করে ফেলা, চাঁদাবাজি ও নারী নির্যাতনের মামলা দিয়ে ফাঁসিয়ে দেওয়া এবং ‘আয়নাঘরে’ বন্দি রাখার মতো ভয়ঙ্কর হুমকি দেওয়া হয়।
পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটলে রবিউল ইসলাম তাঁর সংবাদমাধ্যমের ব্যবস্থাপনা সম্পাদকের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেন। সম্পাদক ফোন রিসিভ করে তাঁদের সংশ্লিষ্ট পত্রিকার সাংবাদিক বলে পরিচয় নিশ্চিত করার পর কিছুটা নমনীয় হয় হামলাকারীরা। তবে এরপরও রবিউল ইসলামের হাত দিয়ে জোরপূর্বক লিখিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয় যে তিনি ‘ভুয়া সাংবাদিক’। তিনি তা স্পষ্টভাবে অস্বীকার করলে তাঁকে একটি সাদা কাগজে জোরপূর্বক স্বাক্ষর দিতে বাধ্য করা হয়। পরে পকেটে ২০০ টাকা গুঁজে দিয়ে হোটেলপক্ষ তা দিয়ে ‘চিকিৎসা করে নেওয়ার’ উপহাস করে এবং আইনি পদক্ষেপ নিলে হত্যার হুমকি দেয়।
হামলা ও হট্টগোলের মধ্যে সাংবাদিক রবিউল ইসলামের পকেটে থাকা একটি মানিব্যাগ হারিয়ে যায়। মানিব্যাগে নগদ ৭ হাজার টাকা, ভিজিটিং কার্ড ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র ছিল বলে জানান তিনি। পরিবেশ নিরাপদ না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে এ বিষয়ে কিছু বলতে পারেননি তাঁরা। হোটেল থেকে বের হয়ে তারা পুরো বিষয়টি ব্যবস্থাপনা সম্পাদককে জানান। সম্পাদক তাঁদের দ্রুত প্রাথমিক চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন এবং এ ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ভুক্তভোগী সাংবাদিকদের অভিযোগ, হোটেলটির এক প্রতিনিধি দাবি করেছেন যে অতীতেও তাঁদের প্রতিষ্ঠানে কোনো পুলিশি অভিযান হয়নি এবং ভবিষ্যতেও হবে না। প্রশাসন ও প্রভাবশালী মহলে নিয়মিত টাকা দিয়েই তারা হোটেলটি পরিচালনা করে আসছেন।
ঘটনার পর থেকে সাংবাদিক সমাজ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা তীব্র নিন্দা জানিয়ে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, জড়িতদের দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোরালো দাবি জানিয়েছেন। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিকরা।
অনলাইন ডেস্ক 





















