
রাষ্ট্রায়ত্ত খাতের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকগুলোতে শীর্ষ নেতৃত্ব নির্বাচনে বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে সরকার। বেসরকারি ব্যাংক থেকে অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের এনে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এই পদক্ষেপে ব্যাংকপাড়ায় স্বস্তির চেয়ে অস্বস্তি ও আলোচনা-সমালোচনাই বেশি তৈরি হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী—
অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে মনোনয়ন পেয়েছেন যমুনা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) নূর মোহাম্মদ।
জনতা ব্যাংকের এমডি ও সিইও পদে মনোনীত হয়েছেন সাউথইস্ট ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চিফ রিস্ক অফিসার মো. মাহবুব আলম।
বেসিক ব্যাংকের এমডি হিসেবে নিয়োগে সম্মতি দেওয়া হয়েছে জনতা ব্যাংকের ডিএমডি মো. নূরুল হুদাকে।
অন্যদিকে, সোনালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও মো. শওকত আলী খান-এর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের আগের আদেশ প্রত্যাহার করায় তিনি স্বপদে বহাল থাকছেন।
বেসরকারি ব্যাংক থেকে হঠাৎ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের শীর্ষ পদে কর্মকর্তা নিয়ে আসার বিষয়টি ভালোভাবে নিতে পারছেন না সরকারি ব্যাংকগুলোর নিজস্ব কর্মকর্তারা। তাদের মতে, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম ও পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে ডিএমডি বা এর কাছাকাছি পর্যায়ে পৌঁছানোর পর কর্মকর্তাদের প্রধান প্রত্যাশা থাকে একসময় তারা ব্যাংকের শীর্ষ পদে যাবেন। কিন্তু বাইরে থেকে এসে কেউ সেই দায়িত্ব পেলে নিচের সারির কর্মকর্তাদের কাজের স্পৃহা ও উদ্যম কমে যায়।
এ ছাড়া অনেক কর্মকর্তা মনে করছেন, বেসরকারি ব্যাংকের সংস্কৃতি আর রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কার্যক্রমের ধরণ সম্পূর্ণ আলাদা। ফলে বাইরে থেকে আসা নেতৃত্ব অভ্যন্তরীণ চেইন অব কমান্ড ভেঙে ফেলতে পারে এবং নতুন এমডিদের প্রতি কর্মীদের সহযোগিতায় অনীহা তৈরি হতে পারে।
বর্তমানে অগ্রণী ব্যাংকসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বেশ কিছু শাখায় (যেমন—সৈয়দপুর, কাশিনাথপুর, ছেংগারচর বাজার, লালদিঘী করপোরেট ও শ্রীনগর শাখা) বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ, ভল্ট থেকে টাকা সরিয়ে নেওয়া এবং লকারের স্বর্ণালংকার চুরির মতো চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকির চরম দুর্বলতার সুযোগেই এসব কেলেঙ্কারি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এমন নাজুক পরিস্থিতির মধ্যে ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পূর্বঅভিজ্ঞতাসম্পন্ন কাউকে দায়িত্ব দিলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সহজ হতো বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টরা।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক এম হেলাল আহম্মেদ খানের মতে, সরকারি বা বেসরকারি—কোথা থেকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হলো, সেটি বড় বিষয় নয়; বরং প্রার্থীর পেশাদারিত্ব, সংকট উত্তরণে দক্ষতা, যোগ্যতা এবং স্বচ্ছতাই মুখ্য। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিবেচনা পুরোপুরি পরিহার করে পূর্ণ পেশাদারিত্ব নিশ্চিত না করলে ব্যাংক খাতের বিদ্যমান আস্থার সংকট আরও ঘনীভূত হতে পারে।
সব মিলিয়ে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এই শীর্ষ পদগুলোতে নতুন মুখের আগমন ব্যাংক খাতের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কতটা সফল হয় এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যকার দূরত্ব বা ক্ষোভ কীভাবে নিরসন করা হয়—এখন সেটাই দেখার বিষয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















