Dhaka ০৭:০১ অপরাহ্ন, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
উরুর চোটে মাঠের বাইরে জোয়াও পেদ্রো ভূরুঙ্গামারীতে ৪ লাখ টাকার ভারতীয় মোবাইলসহ আন্তঃজেলা চোরাকারবারি চক্রের প্রধান গ্রেফতার ভোর রাতে গোবিপ্রবির বনলতা ও অপরাজিতা হলে চুরি: নিরাপত্তা নিয়ে তীব্র ক্ষোভ শিক্ষার্থীদের সমুদ্রের প্রলয়ংকরী ঝড়ের নামকরণ যেভাবে হয়, আসছে যে ১০ নাম ছোটপর্দায় নতুন যাত্রায় অভিনেত্রী নূপুর আহসান, আসছে ৭টি নতুন প্রজেক্ট ৬৬ বছরের ইতিহাসে সেরা অঘটন দেখল বিশ্ব বগুড়ায় পুলিশ পরিচয়ে ১০২ ভরি সোনা ছিনতাই: ৪ জন গ্রেপ্তার, ৮৮ লাখ টাকা উদ্ধার টাইব্রেকারের স্নায়ুক্ষয়ী লড়াইয়ে সিশেলসকে হারিয়ে ফিফা অনূর্ধ্ব-১৫ বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে বাংলাদেশ অদক্ষ নয়, দক্ষ জনশক্তি রপ্তানি করাই সরকারের মূল লক্ষ্য: আরিফুল হক চৌধুরী গোপালগঞ্জে শিশু তালহা হত্যা মামলা: দুইজনের ফাঁসি, একজনের যাবজ্জীবন

গণপূর্তের প্রকৌশলী শামসুল আরেফিনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়ন একটি বিধিবদ্ধ প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। তবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল শাখার উপসহকারী/সহকারী প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিনের বদলি ও পদায়ন ঘিরে উঠেছে নানা প্রশ্ন। তার বিরুদ্ধে একাধিক প্রকল্পে স্বনামে-বেনামে ঠিকাদারি, অর্থ আত্মসাৎ, ঘুষ লেনদেন এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে বারবার ঢাকায় অবস্থান ধরে রাখার অভিযোগ উঠেছে। জুলাই আন্দোলনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কুমিল্লায় বদলি হলেও দেড় বছরের মাথায় তিনি আবারও ঢাকার একই প্রভাবশালী পদে ফিরে এসেছেন। এসব অভিযোগের পাশাপাশি জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়েও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা ডিভিশন-৬-এ কর্মরত থাকাকালে শামসুল আরেফিনের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বিশেষভাবে সামনে আসে। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ওই ডিভিশনের একাধিক সরকারি প্রকল্পে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রকল্পের প্রাক্কলন তৈরি থেকে শুরু করে কাজের তদারকি ও চূড়ান্ত বিল অনুমোদন—প্রতিটি পর্যায়েই তার প্রভাব ছিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারদের কেউ কেউ।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, বিল ছাড়ের বিভিন্ন পর্যায়ে তাদের নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হতো। দাবিমতো অর্থ না দিলে ফাইলে জটিলতা তৈরি করে বিল আটকে রাখা হতো। একাধিক ঠিকাদারের ভাষ্য, কাজ পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে শামসুল আরেফিন ঊর্ধ্বতন প্রকৌশলীদের নাম ব্যবহার করে তাদের কাছ থেকে অর্থ নিতেন।
এক ঠিকাদার বলেন, কাজ পাওয়ার কথা বলে তিনি বারবার উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম উল্লেখ করতেন। টাকা না দিলে বিল আটকে থাকত। অনেকে বাধ্য হয়েই দিয়েছেন।
অন্য এক ঠিকাদারের অভিযোগ, তিনি বলতেন—উপরের লোকজন ঠিক আছে, শুধু টাকা দাও। পরে দেখা গেছে, কাজও হয়নি, টাকাও ফেরত আসেনি।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রকৌশলী শামসুল আরেফিন ‘পরে কথা বলব’ বলে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে তার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম বলেন, কেউ যদি উপরের কারও নাম ভাঙিয়ে ঠিকাদারের কাছ থেকে সুবিধা নিয়ে থাকেন, তাহলে তার দায়িত্ব তাকেই নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কেউ কাউকে এ ধরনের কাজ করার সুযোগ দেয় না। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রশাসনিক নীতি অনুযায়ী, নির্দিষ্ট সময় পর কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলির বিধান থাকলেও শামসুল আরেফিন তার কর্মজীবনের সিংহভাগ সময় কৌশলে ঢাকায় কাটিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। জুলাই আন্দোলনের পর প্রশাসনে স্বচ্ছতা ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তাকে কুমিল্লায় বদলি করা হয়। তবে দেড় বছরের মাথায় তিনি আবারও ঢাকার একই অফিসে সমমানের পদে ফিরে আসেন।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে, ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে ম্যানেজ করেই তিনি বারবার নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তবে এ অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং বদলি-পদায়নের প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম হয়েছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
শামসুল আরেফিনের বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানী সূত্রের দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন অভিজাত এলাকা ও বিকাশমান আবাসন প্রকল্পে তার এবং নিকটাত্মীয়দের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। সরকারি বেতনের সঙ্গে এসব সম্পদের মালিকানার সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
দুদকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, শামসুল আরেফিনের বিরুদ্ধে স্বনামে-বেনামে ঠিকাদারি, প্রকল্পের অর্থ আত্মসাৎ এবং জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের বিষয়ে একটি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ কমিশনের হাতে এসেছে। অভিযোগটি আমলে নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নথিপত্র তলব করা হচ্ছে। অনুসন্ধানের অগ্রগতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলেন, গণপূর্ত অধিদপ্তর কোনো ব্যক্তিগত অনিয়ম বা দুর্নীতির দায় নেবে না। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা বজায় রাখতে আমরা বদ্ধপরিকর। যেকোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে প্রশাসনিক তদন্তের মাধ্যমে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। মো. শামসুল আরেফিনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ এবং বদলি-সংক্রান্ত বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে। দুদক স্বাধীনভাবে তদন্ত শুরু করেছে বলে আমরা আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সব ধরনের প্রয়োজনীয় তথ্য ও দাপ্তরিক সহযোগিতা প্রদান করব।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারি প্রকৌশল বিভাগে সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার অপব্যবহার নতুন কিছু নয়। বারবার একই ব্যক্তির ঢাকায় ফিরে আসা এবং আয়বহির্ভূত সম্পদের অভিযোগ গুরুতর। দুদকের অনুসন্ধানকে স্বাগতভাবে এগোতে দিতে হবে এবং প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। না হলে স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে যাবে।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের সাধারণ ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা সরকারি সেবা খাতে স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অভিযোগগুলোর দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তাদের বক্তব্য, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সম্পদ বাজেয়াপ্তসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় একই চক্র আবারও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।
শামসুল আরেফিনের ঢাকায় দ্রুত প্রত্যাবর্তন, তাকে ঘিরে সিন্ডিকেটের অভিযোগ এবং দুদকের প্রাথমিক অনুসন্ধান—সব মিলিয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের অভ্যন্তরীণ স্বচ্ছতা ও বদলি-পদায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী ও টিআইবির নির্বাহী পরিচালক অভিযোগ প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। এখন এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির দায় নিরূপণের ক্ষেত্রে দুদকের অনুসন্ধান ও অধিদপ্তরের প্রশাসনিক তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোচিত

উরুর চোটে মাঠের বাইরে জোয়াও পেদ্রো