
খুলনার বহুল আলোচিত শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে দীর্ঘ ভোগান্তির পর অবশেষে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। কাজ না করেই কোটি টাকা বিল দেওয়া এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে অর্থ ছাড়ের অভিযোগে দুই ঠিকাদার ও খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (কেডিএ) ছয় প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে দুটি পৃথক মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে এই দুর্নীতির পেছনে কেডিএর শীর্ষ কর্তা ও নীতিনির্ধারকদের সংশ্লিষ্টতা থাকলেও তাঁদের আসামির তালিকা থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র সমালোচনা।
রোববার দুদকের উপ-সহকারী পরিচালক আশিকুর রহমান বাদী হয়ে দুদক খুলনা সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে মামলা দুটি দায়ের করেন। অভিযোগে বলা হয়েছে:
প্রথম মামলা: কোনো কাজ সম্পন্ন না করেই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে এক কোটি ৫৫ লাখ টাকা বিল পাইয়ে দেওয়া।
দ্বিতীয় মামলা: ঠিকাদারের অনুকূলে অতিরিক্ত অর্থ ছাড় করে ১১ কোটি ১৯ লাখ টাকা রাজস্ব হিসেবে স্থানান্তর করা।
দুদকের দায়ের করা মামলায় মোট আটজনকে আসামি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন—
১. মো. আতাউর রহমান (চেয়ারম্যান, আতাউর রহমান খান লিমিটেড)
২. শেখ মাহাবুব রহমান (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, মাহাবুব ব্রাদার্স লিমিটেড)
৩. কাজী সাবিরুল আলম (প্রধান প্রকৌশলী, কেডিএ)
৪. শামীম জেহাদ (সাবেক তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, কেডিএ)
৫. মো. আরমান হোসেন (প্রকল্প পরিচালক, কেডিএ)
৬. মুনতাসির মামুন (নির্বাহী প্রকৌশলী, কেডিএ)
৭. বাসুদেব কুমার বিশ্বাস (সহকারী প্রকৌশলী, কেডিএ)
৮. শরীফ ওয়াহিদুজ্জামান (উপ-সহকারী প্রকৌশলী, কেডিএ)
দুদকের এই পদক্ষেপে প্রশ্ন উঠেছে মূল অপরাধীদের দায়মুক্তি নিয়ে। কেডিএ সূত্রে জানা যায়, বিল অনুমোদন থেকে শুরু করে প্রকল্পের সমস্ত নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত আসত সংস্থার শীর্ষ পর্যায় থেকে। নিম্নস্তরের প্রকৌশলীরা জানান, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী ঠিকাদারদের দাপটে তারা কোনো অনিয়মের প্রতিবাদ করতে সাহস পাননি।
অথচ গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের গঠিত তদন্ত কমিটি কেডিএর তিন সদস্যসহ মোট ১৪ জনের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করলেও, দুদক তাদের মামলায় আসামি করেনি। এমনকি কেডিএর চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালনকারী সামরিক কর্মকর্তাদের বিষয়েও তদন্ত প্রতিবেদনে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।
এ বিষয়ে দুদকের খুলনা জেলা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী জানান, প্রাথমিক অনুসন্ধান শেষে বর্তমানে মামলা দুটি করা হয়েছে এবং তদন্তকালে অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেলে তাদেরও আইনের আওতায় আনা হবে।
অন্যদিকে, খুলনা মহানগর নাগরিক ফোরামের কো-চেয়ারম্যান সরদার আবু তাহের এই অবস্থাকে ‘দুঃখজনক’ বলে উল্লেখ করে বলেন, দীর্ঘ ১৩ বছর ধরে এই সড়ক নিয়ে মানুষ চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছে। অনিয়ম ও দুর্নীতির সাথে জড়িত সকলের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনে ঘটনার পুনঃতদন্ত করতে হবে।
উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ৭ মে একনেক সভায় অনুমোদিত হয় খুলনার শিপইয়ার্ড সড়ক প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প। শুরুর দিকে এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ৯৮ কোটি টাকা নির্ধারিত হলেও দীর্ঘ ১৩ বছরেও তা শেষ হয়নি; উল্টো দফায় দফায় সময় বেড়ে ব্যয় গিয়ে ঠেকেছে ২৮০ কোটি টাকায়। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এই সড়কে দুদকের একটি দল অভিযান চালায়। কাজের দীর্ঘসূত্রিতা ও অনিয়ম নজরে আসার পর তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়, যারই ধারাবাহিকতায় চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে পৃথক দুটি তদন্ত প্রতিবেদন চূড়ান্ত হয়।
অনলাইন ডেস্ক 



















