Dhaka ০৯:১০ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৩১ অক্টোবর ২০২৬, ১৬ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
নাসিরনগরে উপজেলা বিএনপির ইউনিয়ন ভিত্তিক সাংগঠনিক সভার কর্মসূচি ঘোষণা‎‎ গোপালগঞ্জে বিনা ধান-২৬ চাষে ব্যাপক ফলনের সাফল্য পোরশায় স্থানীয়দের সহায়তায় ৩ খুচরা মাদক ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার, ৩২ পিস ট্যাপেন্টাডল জব্দ এম এন লারমার স্মৃতিতে লোগাংয়ে ফুটবলের উৎসব রাণীনগরে প্রতিকূল আবহাওয়ায় ধান ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি গোপালগঞ্জ কলেজের চুরির অভিযোগে ছাত্রদল সভাপতি আটক চট্টগ্রাম কাস্টমসের ওমর কাউসার ও সুমন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে ঘুষ-হয়রানির অভিযোগ, নীরব কর্তৃপক্ষ জরিমানা ছাড়াই গাড়ির কাগজ ও লাইসেন্স হালনাগাদের মেয়াদ বাড়ল ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত, ভোগান্তি এড়াতে অনতিবিলম্বে সুযোগ গ্রহণের পরামর্শ বিআরটিএ ও সচেতন মহলের! যুক্তরাষ্ট্রে উচ্চশিক্ষার সুযোগ বাড়াতে ফুলব্রাইটের সঙ্গে সমঝোতার উদ্যোগ ইউজিসির শিক্ষামন্ত্রীর সঙ্গে কানাডার হাইকমিশনারের সৌজন্য সাক্ষাৎ: শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতার আগ্রহ

গণপূর্তের মোয়াজ্জেমের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ, রাজনৈতিক পরিচয় বদলে প্রভাব ধরে রাখার অভিযোগ

সরকারি স্থাপনায় সবুজায়ন ও পরিবেশ রক্ষা নিঃসন্দেহে একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। কিন্তু সেই উদ্যোগকে কেন্দ্র করেই সরকারি অর্থ আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে। মানিকগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জ সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের আঙিনায় একটি গাছও না লাগিয়ে ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছেন প্রধান বৃক্ষপালনবিদ আবুল কালাম আজাদ। এদিকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনার গণপূর্ত আরবরিকালচার বিভাগের উপবিভাগীয় কর্মকর্তার পদ থেকে মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করে ওই দায়িত্বে মো. রুহুল কুদ্দুসকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে শুধু পদ থেকে প্রত্যাহার নয়, অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের দাবিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের মধ্যেও আলোচনা ও ক্ষোভ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর ডিও লেটার এবং দলীয় শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনা ও প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল স্থাপনায় দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলেন। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-১ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে কাজ করা এবং জালভোট প্রদানে সহায়তার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর মোয়াজ্জেম হোসেন নিজের রাজনৈতিক অবস্থান বদলে বিএনপিপন্থী কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিতি তৈরির চেষ্টা করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের কৌশল বদলালেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগের অবসান হয়নি। বরং নতুন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও কথিত প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সরকারি কাজ ও অর্থের ওপর নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করা হচ্ছে।

মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ নতুন নয়। অভিযোগসংশ্লিষ্টদের দাবি, ২০০৯, ২০১১ ও ২০১২ সালের সরকারি নথিপত্রে চাকরিতে অসদাচরণ, অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থঋণ আদালতের মামলায় ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হওয়ার মতো বিষয়ের উল্লেখ রয়েছে। এত অভিযোগের পরও কীভাবে তিনি বারবার দায়িত্বে বহাল থেকেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকায় নামে-বেনামে বিপুল অবৈধ সম্পদ গড়ে তোলা এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নথি, মামলার অবস্থা ও সম্পদের উৎস যাচাই করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো জরুরি।

গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার করে দীর্ঘদিন একই বিভাগে অবস্থান এবং পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় জাতীয় সংসদের একাধিক প্রভাবশালী নেতা ও তাঁদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে তিনি একই বিভাগে প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় ঠিকাদারি কাজ বণ্টনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে অনিয়মের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

আরও অভিযোগ রয়েছে, নিজের ভাই ও শ্যালকদের ঠিকাদারি লাইসেন্সের মাধ্যমে গণপূর্ত অধিদপ্তরের শতকোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নেওয়া হয়েছে। সরকারি চাকরিবিধিতে সাধারণভাবে একই কর্মস্থলে তিন বছরের বেশি অবস্থানের সীমাবদ্ধতা থাকার কথা উল্লেখ করে অভিযোগকারীরা প্রশ্ন তুলেছেন, কীভাবে মোয়াজ্জেম হোসেন শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বছর দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁদের দাবি, দেশের বিভিন্ন স্থানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকল্পের সংখ্যা সীমিত থাকলেও জাতীয় সংসদকেন্দ্রিক একের পর এক প্রকল্পের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার সুযোগ কাজে লাগানোর অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। এসব প্রকল্পের মধ্যে তাঁর অধীনেই আপন ভাই মনোয়ার হোসেন ঠিকাদারি কাজ করেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিশেষ করে যেসব কাজ বেশি লাভজনক অথবা বাস্তবে যথাযথভাবে সম্পন্ন না করেও বিল তোলার সুযোগ রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা মনে করেন, সেসব কাজ ভাইকে দেওয়া হতো বলে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, জাতীয় সংসদের স্পিকারের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা কামাল বিল্লাহ এবং চিফ হুইপের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা জিলানীর সঙ্গে যোগাযোগ ও তাঁদের সহযোগিতা কাজে লাগিয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন নিজের পদ ধরে রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে গণপূর্তমন্ত্রী মোকতাদির চৌধুরীর ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হুমায়ুনের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে একই ধরনের সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, হুমায়ুন বিসিএসের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রে তাঁর যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মোয়াজ্জেম হোসেনের বাড়ি হুমায়ুনের বাড়ির কাছাকাছি বলেও কথিত রয়েছে।

মোয়াজ্জেম হোসেন ২৪তম বিসিএসের প্রকৌশলী। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে তিনি শেরেবাংলানগর গণপূর্ত বিভাগ-১-এর নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন। এর আগে ওই বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. ফজলুল হকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠার পর তাঁকে বদলি করা হয়েছিল। ফজলুল হকের স্থলাভিষিক্ত হয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন নিজের ভাইকে ঠিকাদারি কাজে যুক্ত করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সে সময়ের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. রোকন উদ্দিনের সঙ্গে যোগসাজশে ভাই ও শ্যালকদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে প্রায় একশ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তোলা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অনিয়মের কারণে রোকন উদ্দিনের চাকরি চলে গেলেও মোয়াজ্জেম হোসেন বহাল রয়েছেন।

জাতীয় সংসদের স্পিকার ও চিফ হুইপের দপ্তরের সহযোগিতা পেয়ে মোয়াজ্জেম হোসেন বেপরোয়া হয়ে উঠেছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে ঊর্ধ্বতন ও অধস্তন কর্মকর্তাদের উপেক্ষা করে নিজের ইচ্ছামতো কাজ পরিচালনা এবং সরকারি প্রকল্প থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। সংসদে কর্মরত দু-একজন সাংবাদিককে প্রভাবিত করে তাঁর অনিয়মের খবর ধামাচাপা দেওয়া হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। সাবেক গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদকে নিয়মিত বিভিন্ন ধরনের সুবিধা দিয়ে তিনি ‘ম্যানেজ মাস্টার’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিলেন বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

সরকার পরিবর্তনের পর গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পদে রদবদল হলেও মোয়াজ্জেম হোসেন দীর্ঘদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত সুনির্দিষ্ট কয়েকটি অভিযোগ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তাধীন রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। এর মধ্যে ঠিকাদার জি কে শামীমকে অবৈধভাবে ১০ কোটি টাকা বিল পরিশোধের বিষয়টি আবারও তদন্তে উঠে এসেছে বলে অভিযোগসংশ্লিষ্ট সূত্রের বক্তব্য।

মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি বলে অভিযোগকারী পক্ষ জানিয়েছে। ফলে তাঁর বক্তব্য এ প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।

সরকারি অর্থে পরিচালিত পরিবেশবান্ধব প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ জনস্বার্থের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত। একই সঙ্গে সরকারি দায়িত্বে থেকে আত্মীয়স্বজনকে ঠিকাদারি সুবিধা দেওয়া, প্রভাব খাটিয়ে পদে বহাল থাকা, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন এবং বিদেশে অর্থ পাচারের মতো অভিযোগগুলোও গুরুতর। সচেতন মহলের দাবি, শুধু বদলি বা পদ থেকে প্রত্যাহার করে দায় এড়ানোর সুযোগ দেওয়া উচিত নয়। অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত করে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, বিল-ভাউচার, ঠিকাদারি লাইসেন্স, সম্পদের বিবরণ এবং অর্থ লেনদেন যাচাই করতে হবে। প্রয়োজনে দুদক ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করে সরকারি অর্থের ক্ষতি নিরূপণ, আত্মসাৎ করা অর্থ উদ্ধারের ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি উঠেছে।

সরকারি অর্থের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সরকারি প্রকল্পে দুর্নীতি প্রতিরোধের স্বার্থে মোয়াজ্জেম হোসেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত প্রতিটি অভিযোগের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এখন সময়ের দাবি। তবে তদন্তের ফলাফল ও প্রামাণ্য নথি প্রকাশের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করাই হবে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার সঠিক পথ।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোচিত