
স্বল্প খরচে নিজস্ব ফ্ল্যাট বা প্লটের স্বপ্ন মানুষের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় করে তুলছে জমির শেয়ারভিত্তিক আবাসন প্রকল্পগুলোকে। তবে এই জনপ্রিয়তার আড়ালে গড়ে উঠেছে এক বিশাল প্রতারণার জাল। লোভনীয় বিজ্ঞাপন, ভুয়া নকশা ও নানা প্রতারণার ফাঁদে পা দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে জমির শেয়ার কিনে বিপাকে পড়েছেন প্রায় ৪০ হাজার বিনিয়োগকারী।
আদালত ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সারা দেশের আদালতগুলোতে এ ধরনের প্রতারণার অভিযোগে ৯ হাজার ৮২৩টি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ১২ হাজার কোটি টাকা জড়িত।
পরিসংখ্যান বলছে, এই প্রতারণার সিংহভাগ ঘটনাই ঘটেছে রাজধানী ও এর আশপাশের জেলাগুলোতে।
ঢাকা মহানগর ও জেলা: ৫,৯৪৮টি মামলা (জড়িত অর্থ প্রায় ৪,৫০০ কোটি টাকা)।
মুন্সীগঞ্জ জেলা: ৫৩৮টি মামলা (জড়িত অর্থ ১,৫০০ কোটি টাকার বেশি)। বিশেষ করে ঢাকা-মাওয়া এক্সপ্রেসওয়েকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অসংখ্য অনুমোদনহীন প্রকল্প ঘিরে এই প্রতারণা বেশি হচ্ছে।
অন্যান্য জেলা: চট্টগ্রাম, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ, নরসিংদী, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, বগুড়াসহ বিভিন্ন বড় শহরেও শত শত মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
তদন্তে ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে প্রতারকদের নানা কৌশলের চিত্র উঠে এসেছে:
উত্তরায় হলিস্টিক হোম বিল্ডার্স: রাজধানীর উত্তরার ১০ কাঠা জমিতে নয়তলা ভবন দেওয়ার কথা বলে ৩৬ জন ক্রেতার কাছ থেকে টাকা নেওয়া হলেও পরে জানা যায় সেটি ভাড়া নেওয়া জমি। একই জমির শেয়ার অন্য ৪০ জনের কাছেও বিক্রি করা হয়। এই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ৪৭০ জন গ্রাহকের প্রায় ২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে সিআইডি মামলা করেছে এবং প্রতিষ্ঠানটির ডিএমডি বর্তমানে কারাগারে আছেন।
সিলেটে খাসজমিতে প্রকল্প: ‘স্বপ্ন ছায়া আবাসন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান সিলেটের লামাবাজারে ৪০ কাঠা সরকারি খাসজমিতে শেয়ারভিত্তিক প্রকল্প দেখিয়ে ১৫০ গ্রাহকের প্রায় ৯০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শামীম খায়রুল ইসলাম ইতোমধ্যে যুক্তরাজ্যে পালিয়ে গেছেন।
অন্যান্য প্রতিষ্ঠান: আফতাবনগরের ‘শেয়ার ল্যান্ড বিল্ড হোম’ এবং মেরুল বাড্ডার ‘আমার বাড়ি আমার ঘর’সহ বিভিন্ন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, অভিযুক্ত ১৬টি প্রতিষ্ঠানেরই আবাসন ব্যবসা পরিচালনার কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছিল না এবং তারা কেউ আবাসন ব্যবসায়ীদের সংগঠন রিহ্যাবের সদস্য নয়।
আবাসন খাতের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব প্রতারক চক্র সাধারণত ভুয়া নকশা, জাল দলিল, নামজারির ভুয়া কাগজপত্র এবং ভাড়া নেওয়া জমিতে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে সাধারণ মানুষকে আকৃষ্ট করে।
রিহ্যাবের সভাপতি ড. মো. আলী আফজাল ও সাবেক সহসভাপতি কামাল মাহমুদ জানান, এ ধরনের প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগের পূর্বে ক্রেতাদের অবশ্যই কিছু বিষয়ে সতর্ক হওয়া উচিত:
প্রতিষ্ঠানটি রিহ্যাবের সদস্য কি না তা যাচাই করা।
প্রকল্পের অনুকূলে রাজউক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বৈধ অনুমোদন রয়েছে কি না তা দেখা।
জমির মালিকানাসংক্রান্ত কাগজপত্র ও দলিলপত্র নিখুঁতভাবে যাচাই করা।
রাজউক জানিয়েছে, অনুমোদনহীন ও অবৈধ আবাসন প্রকল্পগুলোর বিরুদ্ধে তাদের নিয়মিত অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আরও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

























