
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) ক্ষমতার অপব্যবহার, ইউজিসির অনুমোদনহীন অতিরিক্ত জনবল নিয়োগ এবং সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলার পর বিশ্ববিদ্যালয়টির দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির চিত্র প্রকাশ্যে এসেছে। দুদকের পটুয়াখালী সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে দায়ের করা এই মামলায় প্রধান আসামি করা হয়েছে সাবেক উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্ত ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সন্তোষ কুমার বসুকে।
মামলার এজাহার সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) অনুমোদন ছাড়াই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বাইরে অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের মাধ্যমে সরকারের ৮০ লাখ ৭৫ হাজার ১৩১ টাকা আর্থিক ক্ষতি করা হয়েছে। দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় দায়ের করা এই মামলায় তৎকালীন রিজেন্ট বোর্ডের ভূমিকা এবং বাছাই বোর্ডের নিরপেক্ষতা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন উঠেছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাবেক উপাচার্য স্বদেশ চন্দ্র সামন্তের মেয়াদে ৩৯টি পদের বিপরীতে ৫৮ জন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে সেকশন অফিসার পদে মাত্র ৩টি শূন্য পদের বিপরীতে ৬ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যার অন্যতম একজন ছিলেন খোদ তৎকালীন উপাচার্যের ছেলে শাওন চন্দ্র সামন্ত তনু। ২০০৮ সালের ইউজিসি অনুমোদিত অর্গানোগ্রামে সেকশন অফিসারের ৩০টি পদ থাকলেও বাস্তবে সেখানে ৪৮ জনকে পদায়ন করা হয়েছিল।
পবিপ্রবি যেন একপর্যায়ে পারিবারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিল—এমন অভিযোগ তুলে অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে ২৫টিরও বেশি দম্পতিসহ আত্মীয়স্বজনদের এক বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছিল। এই নিয়োগ প্রক্রিয়ায় মেধার মূল্যায়ন না করে অগ্রাধিকার দেওয়া হয় তৎকালীন কর্মকর্তা সমিতির প্রভাবশালী নেতাদের নিকটাত্মীয়, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা ও ছাত্রলীগ নেতাদের স্বজনদের।
শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের চিত্র ছিল সমান্তরাল। ২০২২ সালের মে মাসে ইউজিসির অনুমোদন ছাড়াই ‘পোস্টহারভেস্ট টেকনোলজি অ্যান্ড মার্কেটিং’ বিভাগে প্রভাষক পদের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। সমালোচনার মুখে প্রক্রিয়াটি প্রথমে স্থগিত করা হলেও পরবর্তীতে কোনো নতুন বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই দুজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়, যার মধ্যে এক ছাত্রলীগ নেতার স্ত্রীও অন্তর্ভুক্ত ছিলেন। এছাড়া ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ, অ্যাকাউন্টিং এবং ‘ল অ্যান্ড ল্যান্ড অ্যাডমিনিস্ট্রেশন’ বিভাগে মেধাবীদের বাদ দিয়ে তৎকালীন এক সহকারী অধ্যাপকের স্ত্রীকে নিয়োগ দেওয়ার ঘটনায় তীব্র ছাত্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল।
আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির পাশাপাশি মামলার অন্যতম অভিযুক্ত সাবেক ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সন্তোষ কুমার বসুর বিরুদ্ধে রয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শিক্ষার্থীদের ওপর পৈশাচিক নির্যাতনের গুরুতর অভিযোগ। আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক হল থেকে বের করে দেওয়া এবং প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়ার অভিযোগে তাঁর একটি অডিও ক্লিপ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। তোপের মুখে প্রশাসন তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করলেও স্থায়ী বহিষ্কারের দাবি জানিয়ে আসছেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















