
কোনো ধরনের পূর্বানুমোদন না নিয়েই প্ল্যান্ট স্থাপন করা এবং একাধিকবার আবেদন নাকচ হওয়ার পরও তা চালুর বৈধতা পেতে নতুন করে লবিং শুরু করেছে সুপার পেট্রোকেমিক্যাল পিএলসি (এসপিএল)। সরকারি নীতিমালার তোয়াক্কা না করে সরকারের উচ্চপর্যায়ে দফায় দফায় তদবির এবং এর প্রেক্ষিতে জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে পুনরায় মতামত চাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি নিয়ে জ্বালানি খাতজুড়ে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) স্পষ্ট নেতিবাচক অবস্থান সত্ত্বেও বেসরকারি এই প্রতিষ্ঠানের তৎপরতা রহস্যের জন্ম দিয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পরপরই ২০২৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর অপরিশোধিত তেল আমদানি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য আবেদন করে এসপিএল। তবে ‘বেসরকারি পর্যায়ে রিফাইনারি স্থাপন নীতিমালা-২০২৩’ এর শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় এবং চূড়ান্ত অনুমোদন না থাকায় গত বছরের ১৬ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ সেই আবেদন আনুষ্ঠানিকভাবে নাকচ করে দেয়।
কিন্তু সরকারের এই সিদ্ধান্তকে থোড়াই কেয়ার করে এসপিএল চলতি বছরের ২৯ জানুয়ারি সচিবের কাছে পুনর্বিবেচনার আবেদন জানায়। সেখানে তারা বার্ষিক ১৫ লাখ মেট্রিক টন ক্ষমতার ইউরো-৫ স্ট্যান্ডার্ডের রিফাইনারি চালুর পরিকল্পনা তুলে ধরে। পরবর্তীতে ১৪ জুলাই সরাসরি জ্বালানি মন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়ে দৈনিক ৩৫ হাজার ব্যারেল ধারণক্ষমতার এই প্ল্যান্ট চালুর আকুতি জানানো হয়। এরই ধারাবাহিকতায়, গত ১৮ অক্টোবর সিনিয়র সহকারী সচিব মো. এনামুল হকের স্বাক্ষরে বিপিসি চেয়ারম্যানের কাছে পুনরায় মতামত চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়—যিনি কি না নিজেই এর আগে এসপিএলের প্রথম আবেদনটি খারিজ করেছিলেন।
মন্ত্রণালয় বারবার এ বিষয়ে মতামত চাইলেও বিপিসির অবস্থান শুরু থেকেই কঠোর ও নেতিবাচক। চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত বিপিসির ১০১৭তম বোর্ড সভায় বিষয়টি বিশদভাবে পর্যালোচনা করা হয়।
বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, বর্তমানে সরকারি ইআরএল ইউনিট-২ প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজটি সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাচ্ছে। এই প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দেশের তেল শোধন সক্ষমতা তিন গুণ বৃদ্ধি পাবে এবং এসপিএম প্রকল্পের শতভাগ ব্যবহার নিশ্চিত হবে। এমতাবস্থায় কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় তেল প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনের সুযোগ দেওয়া দেশের জ্বালানি খাতের স্বার্থের অনুকূলে নয় বলে বোর্ড একমত পোষণ করে।
এই পুরো ঘটনার সবচেয়ে বড় আইনি লঙ্ঘন হলো—লাইসেন্স পাওয়ার আগেই এসপিএলের সম্পূর্ণ প্ল্যান্ট নির্মাণ সম্পন্ন করে ফেলা। কোনো ধরনের আইনি বৈধতা ছাড়াই অবকাঠামো গড়ে তোলার এমন কর্মকাণ্ডকে বেআইনি ও অপরাধ হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির প্রকৌশল অনুষদের ডিন ও প্রবীণ জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. এম শামসুল আলম এ প্রসঙ্গে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, অনুমোদন না নিয়ে প্ল্যান্ট গড়ে তোলা একটি গুরুতর অপরাধ। রাষ্ট্র কোনো অবস্থাতেই এমন বেআইনি পদক্ষেপকে প্রশ্রয় বা আইনি রূপ দিতে পারে না। এটি সরকারের নীতিগত বিভ্রান্তি এবং অবৈধ স্থাপনাকে সুরক্ষা দেওয়ার অপচেষ্টা বলে মনে করেন তিনি।
গোটা প্রক্রিয়ায় এক ধরনের অদৃশ্য ও রহস্যময় নীরবতা লক্ষ করা গেছে। এ বিষয়ে এসপিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মোস্তফা হায়দার কিংবা সিইও প্রণব কুমার সাহার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে, বিপিসির একাধিক কর্মকর্তা চিঠি পাওয়ার কথা স্বীকার করলেও মুখ খুলতে নারাজ। এমনকি বিপিসির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি, যা একটি অবৈধ স্থাপনাকে বৈধতা দেওয়ার এই প্রচেষ্টাকে আরও বেশি প্রশ্নবিদ্ধ করে তুলেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























