
সিলেট সিটি করপোরেশনে (সিসিক) দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় একটি প্রভাবশালী ও অসাধু সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শত কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য সামনে এসেছে। নগরবাসীর নাগরিক সেবা ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দকৃত কোটি কোটি টাকা এখন গুটিকয়েক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত পকেটে চলে যাচ্ছে।
সিসিকের বর্তমান প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী দিনরাত মাঠপর্যায়ে ঘুরে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ত্বরান্বিত করার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অনিয়ম দেখলেই তিনি নিজে ছুটে গিয়ে তা সমাধানের চেষ্টা করছেন। তবে নগর ভবনের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে থাকা কতিপয় কর্মকর্তার লুণ্ঠন বাণিজ্যের কারণে তাঁর উন্নয়ন প্রয়াসের সুফল বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। একদিকে প্রশাসক যখন নগরবাসীর জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে ব্যস্ত, ঠিক তখনই এই সিন্ডিকেট নিচুতলা থেকে নিজেদের ঘরে বসেই হরিলুট চালিয়ে যাচ্ছে।
সম্প্রতি সিসিকের ১৪ জন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ২১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা মোহাম্মদ সাদিকুর রহমানসহ একাধিক ভুক্তভোগী ও সচেতন নাগরিক দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) প্রধান কার্যালয়ে সুনির্দিষ্ট নাম ও দাপ্তরিক নথিপত্রসহ নিরপেক্ষ তদন্তের আবেদন করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে খুব শিগগিরই এই চক্রের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নামছে দুদকের একটি শক্তিশালী টিম।
সিসিককে নিজেদের পারিবারিক সম্পত্তি বানিয়ে ফেলা এই সিন্ডিকেটের নেটওয়ার্ক এতটাই গভীরে যে, বদলি বা আত্মগোপনে থেকেও তারা অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার রিমোট কন্ট্রোলে ব্যাকডেটেড ফাইল কারসাজি ও কমিশন বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছেন সিসিক থেকে ঢাকায় বদলিকৃত সাবেক প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুল রহমান এবং বগুড়ায় বদলিকৃত সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আলী আকবর।
সিসিকের প্রশাসনিক ও প্রকৌশলসংক্রান্ত ফাইল অনুমোদনের নির্ধারিত দপ্তর থাকলেও, সিলেট নগরীর ঐতিহ্যবাহী সুরমা মার্কেট থেকে সাবেক মেয়র, সিইও, সচিব, প্রধান প্রকৌশলীসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের হুবহু নকল সিল তৈরি করা হয়েছিল। একটি বিশেষ শোবার ঘরে বসে রাতারাতি অবৈধ ইমারত নকশা ও ব্যাকডেটেড ফাইল অনুমোদন দেওয়া হতো।
এছাড়া, সিসিকের প্রায় ২৫৮ জন অস্থায়ী ও দিনমজুর কর্মচারীকে চাকরি স্থায়ীকরণের ভুয়া আশ্বাস দিয়ে হাইকোর্টের প্রসেসিং ফির নামে জনপ্রতি ১০,০০০ টাকা করে মোট ২৫,৫০,০০০ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই চক্রের বিরুদ্ধে।
নূর আজিজুল রহমান: বিগত দুই দশক ধরে ড্রেনেজ ও নগর উন্নয়ন প্রকল্পের শত শত কোটি টাকার বরাদ্দে একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় রেখেছেন। ২০০৭ সালে যৌথ বাহিনীর হাতে টেন্ডার জালিয়াতিতে গ্রেপ্তার হওয়া এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সেনাসদস্য ল্যান্স করপোরাল মো. দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যু মামলা এবং ছাত্র-জনতার ওপর হামলার মামলাসহ একাধিক ফৌজদারি মামলা রয়েছে।
মো. আলী আকবর: দীর্ঘ কর্মজীবনে ব্যাপক লুটপাট ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। নিজের আপন ভাই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প প্রকৌশলী হওয়া সত্ত্বেও বাস টার্মিনাল ভবনে ফাটল তদন্ত কমিটিতে তাঁকে সমন্বয়ক করা নিয়ে তীব্র বিতর্ক উঠেছিল।
মো. রাজিউদ্দিন খান (নির্বাহী প্রকৌশলী, পূর্ত): ইমারত নির্মাণ বিধিমালা উপেক্ষা করে ঝালোপাড় এলাকায় ৩ ফুট রাস্তার ওপর অবৈধ ভবন নির্মাণ ও ঘুষের বিনিময়ে নকশাবহির্ভূত ভবন অনুমোদনের অভিযোগ রয়েছে। নগরীর গোয়াবাড়িতে ১ কোটি টাকার বিলাসবহুল বাংলো, ৪৫ লাখ টাকার ব্যক্তিগত গাড়ি এবং একাধিক জমি কিনেছেন তিনি।
অন্যান্য কর্মকর্তা: উপসহকারী প্রকৌশলী এ টি এম সাইদুর রহমান, অতিরিক্ত সহকারী প্রকৌশলী বেলাল আহমেদ, প্রধান অ্যাসেসর মো. আব্দুল বাতিত, প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মোহাম্মদ একলিম আবদীন এবং লাইসেন্স প্রধান রুবেল আহমেদের বিরুদ্ধেও নানা অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য ও রাজস্ব আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
বিভিন্ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নিয়ে পরবর্তীতে কাজ না করে বা ভুয়া কারণ দেখিয়ে সেই অর্থ আত্মসাৎ করা হচ্ছে। বাতিল বা ভুয়া প্রকল্পের নামে সিসিকের সরকারি গাড়ি ব্যবহার করে ভাউচার বানিয়ে বিভিন্ন পাম্প থেকে তেল তুলে বাইরে বিক্রি করে হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে কোটি কোটি টাকা।
সিসিকের এই দুর্নীতিবাজ সিন্ডিকেটকে অবিলম্বে অপসারণ, তাদের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ এবং দুদকের কঠোর ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন সাধারণ নগরবাসী।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















