
ব্যাংক থেকে কম সুদে কৃষিঋণ পাওয়ার সরকারি সুযোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে এর সুফল পাচ্ছে না প্রান্তিক কৃষকেরা। বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিমালায় গ্রাহক পর্যায়ে মাত্র ৭ শতাংশ সুদে কৃষিঋণ বিতরণের বিধান এবং ব্যাংকগুলোর জন্য মোট ঋণের অন্তত ৪ শতাংশ কৃষি খাতে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এই ঋণ সরাসরি কৃষকদের হাতে না পৌঁছে বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওর মাধ্যমে বিতরণ করার কারণে সুদের হার ২০ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঘন ঘন সাপ্তাহিক কিস্তির চাপ এবং ঋণের জাঁতাকলে পিষ্ট হয়ে অনেক কৃষক পরিবার সর্বস্বান্ত হচ্ছে। কিস্তির টাকা জোগাড় করতে গিয়ে গবাদি পশু, হাঁস-মুরগি এমনকি ঘরের চাল পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন অনেকে।
গত বছর ১৫ আগস্ট রাজশাহীর পবা উপজেলার মনিরুল ইসলামের পরিবারে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক ঘটনা এই সংকটের ভয়াবহতাকে চরমভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। এনজিওর ঋণের কিস্তি পরিশোধ করতে না পেরে এবং চরম খাদ্যসংকটে পড়ে তিনি স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজে আত্মহননের পথ বেছে নেন। রেখে যাওয়া চিরকুটে তিনি লিখে যান— ‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে।’
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস (জুলাই ও আগস্ট) জুড়ে ব্যাংকগুলো মোট ছয় হাজার ৮৫৮ কোটি টাকা কৃষিঋণ বিতরণ করেছে। এর মধ্যে সরকারি ব্যাংক দুই হাজার ৩৭৫ কোটি এবং বেসরকারি ও বিদেশি ব্যাংক চার হাজার ৪৮৩ কোটি টাকা দিয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, বিতরণ করা এই কৃষিঋণের ৪২.৩৮ শতাংশই বর্তমানে খেলাপি হয়ে পড়েছে।
অধ্যাপক ড. মো. মিজানুর রহমান (নির্বাহী পরিচালক, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড পিস স্টাডিজ): কৃষিঋণ বিতরণে ব্যাংকের পরিচালন ব্যয় বেশি হওয়ার অজুহাতে অনেক ব্যাংক এনজিওর শরণাপন্ন হয়। ফলে কৃষক ঋণ পেলেও তাদের কাঁধে চেপে বসে অতিরিক্ত সুদের বোঝা।
তারেক রেফাত উল্লাহ খান (ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ব্র্যাক ব্যাংক): এনজিওর মাধ্যমে এই ঋণ আদান-প্রদান হলে প্রান্তিক পর্যায়ে সুদের হার ২০ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত উন্নীত হতে পারে।
মোহাম্মদ কামাল হোসেন (পরিচালক, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি): প্রান্তিক পর্যায়ে ক্ষুদ্রঋণ বিতরণে পরিচালন ব্যয় বেশি থাকায় সুদের হার তুলনামূলক বেশি হয়। তবে কম সুদে তহবিল নিশ্চিত করা গেলে এনজিওগুলোও কম সুদে ঋণ দিতে সক্ষম হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গরিব ও প্রান্তিক কৃষকদের এই ঋণের অসহনীয় চাপ থেকে রক্ষা করতে হলে ব্যাংকগুলোকে নিয়মরক্ষার খাতিরে এনজিওর ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সরাসরি কৃষকের কাছে সহজ শর্তে ও কম সুদে ঋণ পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। পাশাপাশি প্রান্তিক পর্যায়ে ব্যাংকিং সেবার পরিধি আরও বাড়ানো জরুরি।
অনলাইন ডেস্ক 

























