
রাজনৈতিক সংঘাত ও দীর্ঘদিনের বিভাজন দূর করে দীর্ঘমেয়াদি শান্তি প্রতিষ্ঠায় ‘রিকনসিলিয়েশন’ বা পুনর্মিলনের তাগিদ দিচ্ছেন দেশটির প্রখ্যাত বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সম্প্রতি ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন-২০২৬’-এ বিষয়টিকে সামনে রেখে আলোচনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় অপরাধের বিচার, দায় স্বীকার ও অনুশোচনা ব্যতিরেকে এই পুনর্মিলন কতটা সম্ভব—তা নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপট এবং আওয়ামী শাসনের পন্থী-অপপন্থীদের ভূমিকা উল্লেখ করে বক্তারা বলেন, কোনো অপরাধীকে আইনি পরিণতি থেকে রেহাই দিয়ে টেকসই পুনর্মিলন সম্ভব নয়। বিচার প্রক্রিয়া, যৌথ তদন্ত, ভুক্তভোগীদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ এবং অপরাধীদের প্রকাশ্যে অনুশোচনা—এই বিষয়গুলোকে পুনর্মিলন প্রক্রিয়ার প্রধান পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
তার মতে, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের সমর্থক ও ক্ষমতাচ্যুত শক্তির মধ্যে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতার সম্ভাবনা নেই। তিনি উল্লেখ করেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ এখনো নিজেদের অপরাধ বা ভুলের জন্য ক্ষমা চায়নি কিংবা অনুশোচনা প্রকাশ করেনি। তবে দলটির যারা প্রত্যক্ষ বা গুরুতর অপরাধে জড়িত ছিল না, তারা যদি প্রকাশ্যে জাতির কাছে ভুল স্বীকার ও ক্ষমা চায়, তবে ভবিষ্যতে তাদের রাজনীতিতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
বিভক্ত জাতিকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে পুনর্মিলনকে আবশ্যক মনে করেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, পরস্পরকে নিশ্চিহ্ন করার অশুভ প্রতিযোগিতা রাষ্ট্রকে অকার্যকর করে তোলে। তবে এই প্রক্রিয়ার সূচনা হতে হবে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের অপরাধ স্বীকার ও অনুশোচনার মধ্য দিয়ে। কিন্তু বর্তমানেও প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের প্রবণতা চলমান থাকায় পুনর্মিলনের কার্যকর পরিবেশ এখনো তৈরি হয়নি।
পুনর্মিলনকে একটি ‘কঠিন কিন্তু অনিবার্য শল্যচিকিৎসা’ (অপারেশন)-এর সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, প্রতিশোধের অশুভ চক্র ভেঙে অর্থনীতি ও দেশকে এগিয়ে নিতে এর বিকল্প নেই। এটি বাস্তবায়নে বিজয়ী বা ক্ষমতাসীন পক্ষকেই মূল দায়িত্ব নিতে হবে। রাষ্ট্রপতি কিংবা সংসদের মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক পুনর্মিলন প্রক্রিয়া শুরুর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
তিনি স্পষ্ট জানান, বিচার প্রক্রিয়া এড়িয়ে কোনো রিকনসিলিয়েশন সফল হতে পারে না। বিশ্বব্যাপী সংঘাত নিরসনে ব্যর্থতার পেছনে প্রধান কারণ ছিল অপরাধীদের রেহাই দেওয়ার চেষ্টা। তাই আগে ফ্যাসিবাদী শাসনের বিচার সম্পন্ন হতে হবে, তারপরই আসবে পুনর্মিলনের প্রসঙ্গ।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে সংঘাতমুক্ত ও শান্তিময় রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ গড়তে ‘জবাবদিহিমূলক বিচার’ এবং ‘রাজনৈতিক সমঝোতা’—উভয়টিই প্রয়োজন। তবে তা অর্জনে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার নীতিগত পরিবর্তন এবং দায় স্বীকারের মানসিকতাই এখন প্রধান নিয়ামক।
অনলাইন ডেস্ক 

























