
বর্তমান সরকারের আমলে আওয়ামী লীগের সাথে সংশ্লিষ্ট অনেক দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারাই ঘুষ দিয়ে নিজেদের পদ-পদবি ঠিক রেখছেন। এমনকি অনেকে প্রমোশনও বাগিয়ে নিয়েছেন। এই তালিকায় সম্প্রতি নাম লেখালেন ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন অর্থাৎ ডিএনসিসির চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ — বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলাম।
সরকারি চাকরির মেয়াদ শেষ হলেও প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলাম বড় অংকের টাকা ঘুষের বিনিময়ে, ডিএনসিসিতে বিদ্যুৎ বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর মতো গুরুত্বপূর্ণ দুই পদই ধরে রাখার জন্য, চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পেয়েছেন। স্থানীয় সরকারবিভাগ গত ২৯ সেপ্টেম্বর এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপনও জারি করেছে।
প্রশ্ন হলো, কত টাকা ঘুষের বিনিময়ে এরকম একজন বড় মাপের দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হলো? জানা যায়, প্রকৌশলী মোঃ রফিকুল ইসলাম যে পরিমান টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেছেন, তাতে সরকার যতই বদলাক, তিনি ঘুষ দিয়ে ঠিকই নিজের পদটি আঁকড়ে ধরে থাকতে পারবেন। রফিকের আলাদিনের চেরাগ এসেছে বেয়াইয়ের লাইসেন্স ব্যবহার করে ঠিকাদারি ব্যবসা চালানোর মাধ্যমে। ২০১২ সাল থেকে তিনি একক দরপত্রের মাধ্যমে বেশিরভাগ কাজ নিজেই আহ্বান, মূল্যায়ন ও কার্যাদেশ দিয়েছেন –যা সরকারি ক্রয় বিধিমালা-২০০৮ এর স্পষ্ট লঙ্ঘন।
কারসাজি করে ডিএনসিসি থেকে ইউনি-ম্যাক ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল কোম্পানির নামে এসব কাজ বাগিয়ে নেওয়া হয়। ইংরেজি দৈনিক দি ডেইলি সানের একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইউনি-ম্যাক ট্রেড ইন্টারন্যশনাল কোম্পানিটি ২০১২ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ডিএনসিসি থেকে অন্তত ২০টি কাজ পেয়েছে। এসব কাজের মূল্য ১০ কোটি ৮৮ লাখ টাকার বেশি। এর মধ্যে রফিকুল ২০১৪ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে ৩ কোটি ৭৪ লাখ টাকার ১৩টি কাজ নিজেই দিয়েছেন।
তার এই অবৈধ কাজ নিয়ে দৈনিক কালবেলাতেও “বেয়াইয়ের লাইসেন্সে প্রকৌশলীর ঠিকাদারি” শিরোনামে একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনও ছাপা হয় গত বছরের ২৮ জুলাই। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকারের লোকজন এ ধরণের সংবাদ প্রকাশের পরেও, রফিকুলের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয় নি। কারণ টাকা দিয়ে সেই সরকারের লোকজনকে ম্যানেজ করে নিয়েছিলেন রফিকুল।
বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর রফিকুলের যাবতীয় অনিয়ম ও দুর্নীতি তুলে ধরে ডিএনসিসির দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছিল। ঠিকাদারের টাকায় ইউরোপ ভ্রমণ করছিলেন রফিকুল এবং তা নিয়ে দৈনিক যুগান্তরে সংবাদ ছাপা হয়েছিল। সেই সংবাদ থেকে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৩০ মে ঠিকাদারের টাকায় বিদেশ ভ্রমণে যেতে মন্ত্রণালয় থেকে অনুমোদন নিয়েছিলেন রফিকুল। কিন্তু হাসিনা সরকারের পতনের পর এই বিদেশ সফর বাতিল না করে, চিত্তবিনোদন করতে এই সফরে অংশ নেন তিনি।
৩৬৯ কোটি টাকার সড়কবাতি প্রকল্পের যেই দুর্নীতি হয়েছিল, তা নিয়েও বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশ হয়েছিল। ওই দুর্নীতির সাথেও এই রফিকুল জড়িত ছিলেন। তাছাড়া দৈনিক কালের কণ্ঠের এক রিপোর্ট থেকেও জানা যায়, ডিএনসিসির নানা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, বিশেষ করে স্মার্ট এলইডি স্ট্রিট লাইট প্রকল্পের টাকাও নয়ছয় করেছেন এই ব্যক্তি। এ রকমের এক চিন্নিত দুর্নীতিবাজ মানুষের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তাই নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে –এটাই কি সবার আগে বাংলাদেশকে প্রাধান্য দেয়া, নাকি সবার আগে রফিকুলের মতো দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয় দেয়া?
অনলাইন ডেস্ক 




















