
রাজধানীর ভাটারা থানার পুলিশ অফিসার্স হাউজিং সোসাইটি-১ এলাকায় পুলিশের অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) আবদুল্লাহ আল জহিরের একটি ভাড়া বাসায় ডিবি পুলিশের একটি বিশেষ অভিযানকে কেন্দ্র করে তীব্র বিতর্ক ও প্রশ্ন উঠেছে। গত ১৯ অক্টোবর দিবাগত রাতের ওই অভিযানে আটক ৮৫ জনের সবাইকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সাজা দেওয়া হলেও পুরো প্রক্রিয়া নিয়ে স্বজন ও আইনি মহলে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের ডিবির ডিসি ইলিয়াস কবীরের নেতৃত্বে ওইদিন রাতে অভিযানটি পরিচালিত হয়। জানা যায়, রাত আটটা থেকে অতিথিরা আসা শুরু করলেও রাত সাড়ে ১২টার দিকে ডিবির ৪০ থেকে ৫০ জনের একটি দল বাসায় প্রবেশ করে। সে সময় উপস্থিত সবাইকে দুটি কক্ষে আটকে রাখা হয় এবং ভোরের দিকে তাঁদের ডিবি কার্যালয়ে নিয়ে গিয়ে সাজা দেওয়া হয়।
অভিযুক্তদের স্বজন ও বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, ঘটনাস্থলে দীর্ঘ সময় আটকে রাখার পর আসামিদের মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার কথা বলে একটি কাগজে সই নেওয়া হয়েছিল। অথচ পরবর্তীতে তাঁদের মাদক মামলায় সাজা দেওয়া হয়।
ডিএমপির উত্তরা বিভাগের স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আসাদুজ্জামান এই সাজা প্রদান করেন। রায়ে পুরুষদের ১ মাস করে কারাদণ্ড ও ১ হাজার টাকা জরিমানা এবং নারীদের ১৫ দিন করে কারাদণ্ড ও ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়। ৪০ জনের কাছ থেকে জরিমানা আদায়ের নথিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৩৬(৫) ধারার কথা উল্লেখ রয়েছে।
তবে ম্যাজিস্ট্রেটের দাবি, আসামিরা দোষ স্বীকার করায় এ সাজা দেওয়া হয়েছে। বিপরীতে স্বজনদের দাবি, জোর করে বা ভুল বুঝিয়ে সই নেওয়া হয়েছে এবং তাঁরা আদালতের কাছে কোনো দোষ স্বীকার করেননি।
ডিবির জব্দ তালিকায় একটি খালি, একটি ভরা ও দুটি আংশিক ভরা মদের বোতল, একটি ইয়াবা বড়ি, ইয়াবা সেবনের সরঞ্জাম এবং সামান্য পরিমাণ কুশ উদ্ধারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এই অভিযান ও জব্দ তালিকা নিয়ে বড় কয়েকটি প্রশ্ন সামনে এসেছে:
১. মাদক পরীক্ষা ছাড়াই সাজা: মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ৩৬(৫) ধারা অনুযায়ী নেশাগ্রস্ত অবস্থায় শান্তি বিনষ্টের কথা বলা হলেও, আটকদের কেউ আসলেই মাদক সেবন করেছিলেন কি না—তা কোনো ধরনের ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়াই সাজা দেওয়া হয়েছে।
২. সিসিটিভি ক্যামেরা রহস্য: অভিযোগ রয়েছে, অভিযান শুরুর পরপরই পুলিশ ভবনের সিসিটিভি ক্যামেরাগুলো খুলে নেয় এবং মেমোরি কার্ড নিয়ে নেয়। তবে জব্দ তালিকায় ক্যামেরার মেমোরি কার্ডের কোনো উল্লেখ নেই।
৩. ডিজে পার্টির সরঞ্জামের অনুপস্থিতি: পুলিশ দাবি করেছে বাড়িটিতে ডিজে পার্টি হতো, কিন্তু জব্দ তালিকায় ডিজে পার্টির কোনো সরঞ্জাম পাওয়া যায়নি।
৪. বাস্তবতার সঙ্গে অমিল: অভিযুক্তদের একজন বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর বাবা দাবি করেছেন, তাঁর ছেলে অতিরিক্ত ডিআইজির ওই বাসায় একটি অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজাতে গিয়ে আটকা পড়েছিলেন। এছাড়া ওই বাড়ির চারপাশ ফাঁকা থাকায় জনশান্তি বিঘ্নিত হওয়ার বিষয়টিও প্রশ্নবিদ্ধ।
৫. ভিডিও ফাঁস: সবাইকে দুটি কক্ষে বন্দি রাখার সময় পুলিশ সদস্যদের ধারণ করা ভিডিও কীভাবে বাইরে ছড়িয়ে পড়ল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ঘটনার পর ডিআইজি আবদুল্লাহ আল জহিরকে তাঁর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ব্লাস্ট, হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস), নারীপক্ষ ও সপ্রাণসহ ১০১ জন নাগরিক যৌথ বিবৃতি দিয়ে এই ঘটনার স্বাধীন তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বলেন, “দোষ স্বীকার করলেই মাদক মামলায় সঙ্গে সঙ্গে সাজা দিয়ে দেওয়া যায় না। ডিবির ভয়ভীতি প্রদর্শনের মুখে ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব ছিল অভিযোগ যাচাই করা এবং মাদক পরীক্ষা নিশ্চিত করা।”
আরেক জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এহসানুল হক সমাজী বলেন, আটকদের ছবি ও ভিডিও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মাধ্যমে যেভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, তা আইনসম্মত হয়েছে কি না এবং এর মাধ্যমে গোপনীয়তার অধিকার কতটুকু লঙ্ঘিত হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
অনলাইন ডেস্ক 

























