
পিরোজপুরের পর এবার মাদারীপুর জেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক অনিয়ম ও দুর্নীতির গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। আওয়ামী শাসনামলে জেলার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী এবং বর্তমানে একটি বড় সরকারি প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) বাবুল আখতারের বিরুদ্ধে এই সিন্ডিকেট ও লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, করোনাকালীন সময়কে কেন্দ্র করে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পে শতকোটি টাকার অনিয়ম হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়ায় জালিয়াতি, গোপনে ডিএফপি অনুমোদনহীন অখ্যাত পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশ, কাগজপত্রে কাজ দেখিয়ে বিল আত্মসাৎ এবং অতিমূল্যে কার্যাদেশ প্রদানের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে এসব অভিযোগের তথ্য দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)-এর নজরেও আনা হয়েছে।
সাধারণত সরকারি নির্মাণকাজে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে কম দরে কার্যাদেশ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও, মাদারীপুর এলজিইডিতে এর উল্টো চিত্র দেখা গেছে। প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে কোটি কোটি টাকা বেশি ব্যয়ে কাজ দেওয়ার সুনির্দিষ্ট কিছু তথ্য উঠে এসেছে—
শিবচর উপজেলার সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প (দরপত্র আইডি: ৫৮৯৬৪৫): আড়িয়াল খাঁ ব্রিজ থেকে বাবলাতলা বাজার এবং শিবচর সদর থেকে রাজৈর ভায়া উত্রাইল জিসি সড়ক উন্নয়ন প্রকল্পে ২৩ কোটি ১৮ লাখ টাকা প্রাক্কলনের বিপরীতে ২৬ কোটি ৬০ লাখ টাকায় কার্যাদেশ দেওয়া হয়। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনাল প্রায় ১৪.৭৪ শতাংশ বা প্রায় ৩ কোটি ৪১ লাখ টাকা বেশি দামে এই কাজটি পায়। একই দরপত্রের আরেকটি প্যাকেজেও ২২ কোটি ৫৪ লাখ টাকা প্রাক্কলনের বিপরীতে প্রায় ৯.৮৫ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দিয়ে সরকারের প্রায় ২ কোটি ২২ লাখ টাকা ক্ষতি করা হয়েছে।
সেতু নির্মাণ প্রকল্প (দরপত্র আইডি: ৫৬০৫০৫): অনূর্ধ্ব ১০০ মিটার সেতু নির্মাণ প্রকল্পের অধীনে প্রায় ১৬ কোটি ৯৭ লাখ টাকার কাজেও মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনালকে প্রায় ৯.৮৩ শতাংশ বেশি দামে কার্যাদেশ দেওয়া হয়, যেখানে অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয় প্রায় ১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
মাদারীপুর সদর উপজেলা প্রকল্প: আরসিআইপি প্রকল্পের আওতায় প্রায় ২৮ কোটি ৫৩ লাখ টাকার একটি প্রকল্পে ‘ভুয়া প্রাক্কলন’ তৈরি করে অনুমোদন নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। কাজটি দেওয়া হয়েছিল মেসার্স কহিনুর এন্টারপ্রাইজ-কে।
অনুসন্ধানে আরও বেশ কিছু ছোট ও মাঝারি প্রকল্পে অস্বাভাবিক উচ্চ দরে কার্যাদেশ দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে:
দরপত্র আইডি ২৬২৯৭৫ (প্যাকেজ ২২৮): ৪.৯৩ শতাংশ বেশি দামে মেসার্স পাভেল এন্টারপ্রাইজ-কে কার্যাদেশ।
দরপত্র আইডি ৩৩৮৩২৯ (প্যাকেজ ৩০৮): ৪.৯৫ শতাংশ বেশি দামে হাবিবা কনস্ট্রাকশন-কে কার্যাদেশ।
দরপত্র আইডি ৩১৬০৬৯ (প্যাকেজ ২৭৮): ৪.৯৭ শতাংশ বেশি দামে মেসার্স মোহাম্মদ ফারুক মিয়া-কে কার্যাদেশ।
দরপত্র আইডি ২৬২৯৭৬ (প্যাকেজ ২১৪): ৪.৯৭ শতাংশ বেশি দামে মেসার্স হামীম ইন্টারন্যাশনাল-কে কার্যাদেশ।
দরপত্র আইডি ৩৩৮৩৩০ (প্যাকেজ ৩০৯): ৯.৪৯ শতাংশ বেশি দামে মেসার্স আতাহার এন্টারপ্রাইজ-কে কার্যাদেশ।
দরপত্র আইডি ৩৩৩২০০ (প্যাকেজ ২৮০): ৯.৭২ শতাংশ বেশি দামে মেসার্স মাদবর ট্রেডার্স-কে কার্যাদেশ।
এ ছাড়া কয়েকটি এইচবিবি ও ড্রেনেজ প্রকল্পেও প্রাক্কলিত মূল্যের তুলনায় প্রায় ৫ শতাংশ পর্যন্ত অতিরিক্ত দরে কার্যাদেশ দিয়ে লাখ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। ২০২০-২০২১ অর্থবছরের সার্বিক কাজ অনুসন্ধান করলেই এসব অনিয়মের আসল রহস্য উন্মোচিত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
এলজিইডির বিশেষ সূত্রে জানা যায়, নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বাবুল আখতার তাঁর ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারি সিন্ডিকেটকে সুবিধা পাইয়ে দিতে টেন্ডার প্রক্রিয়ায় সরাসরি প্রভাব বিস্তার করতেন। একাধিক প্রকল্পে একই ধরনের উচ্চ দর অনুমোদনের ঘটনায় পরিকল্পিত যোগসাজশের স্পষ্ট ইঙ্গিত মিলেছে। স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, করোনাকালীন সময়ে প্রশাসনিক নজরদারির দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে এই বিপুল পরিমাণ সরকারি অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তা বাবুল আখতারের মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। ফলে তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে স্থানীয় নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও এলজিইডির সংশ্লিষ্টরা এই ঘটনার পূর্ণাঙ্গ ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন। তাঁদের মতে, টেন্ডার প্রক্রিয়া, প্রাক্কলন অনুমোদন, কার্যাদেশ প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের আর্থিক নথিপত্র স্বাধীনভাবে নিরীক্ষা করা হলে অনিয়মের প্রকৃত চিত্র জাতির সামনে স্পষ্ট হয়ে উঠবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























