
চাকরিজীবনের বিদায়লগ্নেও থমকে যায়নি তাঁর বেপরোয়া দুর্নীতি; বরং ১ অক্টোবরের পিআরএল (পিআরএল শুরু) সামনে রেখে রাতভর চলছে ‘ফাইল ছাঁটাই ও কমিশন আদায়ের উৎসব’। গণপূর্ত অধিদপ্তরের এই শীর্ষ কর্মকর্তার নাম মো. আবুল খায়ের, যাকে ঠিকাদার পাড়া ও প্রকৌশলী মহলে সবাই চেনেন ‘মিস্টার ৫% খায়ের’ নামে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, শেষ মুহূর্তের অনৈতিক সুবিধা নিতে গভীর রাত পর্যন্ত অফিসে বসে বিতর্কিত, ত্রুটিপূর্ণ ও বড় ধরনের আর্থিক অসঙ্গতি থাকা ফাইলগুলোতে তড়িঘড়ি সই করছেন তিনি। অগ্রিম কমিশন বুঝে পেয়ে ছাড়ছেন বকেয়া বিল ও নতুন কার্যাদেশ।
সিন্ডিকেটের মূলে ‘৫% কমিশন’ চট্টগ্রাম, গোপালগঞ্জ, রংপুর, কুমিল্লা থেকে ঢাকা জোনে দায়িত্ব পালনকালে আবুল খায়ের গড়ে তোলেন এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট। উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন, ঠিকাদার নিয়োগ কিংবা বিল পাসের জন্য তাঁর টেবিল পার হতে নির্দিষ্ট ৫ শতাংশ কমিশন বাধ্যতামূলক ছিল। commission দিতে দেরি হলে লাল ফিতার দৌরাত্ম্যে ফাইল আটকে রাখা হতো, এমনকি অবাধ্য ঠিকাদারদের তালিকাভুক্ত (ব্ল্যাকলিস্ট) করার হুমকি দেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
ঢাকা জোনের এক ভুক্তভোগী ঠিকাদার ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ৫ শতাংশ কাটমানি ছাড়া তাঁর টেবিলে কোনো ফাইল নড়ত না। অবসরে যাওয়ার ঠিক আগের দিনগুলোতে আগের কমিশন উসুল করতে ঠিকাদারদের ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি, হুমকি দিচ্ছেন চলতি প্রকল্পের বিল আটকে রাখার।
অভিজাত এলাকায় ২৪ ফ্ল্যাট ও শত কোটি টাকার সম্পদ বছরের পর বছর অনৈতিক লেনদেনের মাধ্যমে গড়ে তুলেছেন বিশাল সম্পদের পাহাড়। অনুসন্ধান বলছে, খায়ের ও তাঁর নিকটাত্মীয়দের নামে ঢাকার গুলশান, বনানী, ধানমন্ডি ও উত্তরায় অন্তত ২৪টি বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের তথ্য মিলেছে। এছাড়া পূর্বাচল, জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ভিআইপি জোন এবং ময়মনসিংহে বিঘার পর বিঘা জমি ও খামারবাড়ি রয়েছে তাঁর।
জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপূর্বে দায়িত্ব পালনকালে নকশা জালিয়াতি, অনিয়ম করে প্লট বরাদ্দ এবং ভুয়া বিল ভাউচার বানিয়ে একা ৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের গুরুতর অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
যা বলছেন সহকর্মীরা সাধারণত অবসরের আগে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা দায়িত্ব হস্তান্তর ও নিজেদের পেনশনের কাগজপত্রের কাজে ব্যস্ত থাকেন। তবে গণপূর্তের অন্যান্য কর্মকর্তারা জানান, খায়ের সম্পূর্ণ উল্টো পথে হেঁটে গভীর রাত পর্যন্ত ফাইল অনুমোদন করছেন, যাতে ব্যাকডেটে সই করে বিতর্কিত প্রকল্প ও বিল পাস করে দেওয়া যায়।
দুদকের নজরদারি ও সম্ভাব্য আইনি পদক্ষেপ বিদায়বেলায় এই বেপরোয়া দুর্নীতি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর নড়েচড়ে বসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
দুদকের অনুসন্ধান টিমের এক কর্মকর্তা জানান, অভিযোগগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর। তিনি যেন পিআরএল-এর সুযোগ নিয়ে জবাবদিহিতার বাইরে যেতে না পারেন, সেজন্য প্রাথমিক তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহের কাজ চলছে। প্রয়োজনে তাঁর ব্যাংক হিসাব ফ্রিজ করা এবং দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারির প্রক্রিয়া বিবেচনাধীন রয়েছে।
গণপূর্তের সাধারণ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের এখন একটাই দাবি—পরিবর্তিত সময়ে এমন লাগামহীন দুর্নীতির সঠিক বিচার এবং শেষ মুহূর্তের এই লুটপাট বন্ধ করে তাঁকে আইনের আওতায় আনা হোক।
অনলাইন ডেস্ক 





















