
সহকারী প্রকৌশলী পদে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত বিসিএস ক্যাডার ও পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যবর্তী জ্যেষ্ঠতা (Seniority) নির্ধারণ নিয়ে দুই পক্ষের দফায় দফায় মামলা ও আইনি জটিলতায় স্থবির হয়ে পড়েছে গণপূর্ত অধিদপ্তরের নিয়মিত পদোন্নতি কার্যক্রম। এর ফলে বর্তমানে দপ্তরটিতে শতাধিক যোগ্য কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে আছেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার্বিক দাপ্তরিক ও উন্নয়নমূলক কাজের ওপর।
বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরে উপবিভাগীয় প্রকৌশলীর (সিভিল) ৪১টি এবং তড়িৎ ও যান্ত্রিক শাখায় ৩১টি—অর্থাৎ মোট ৭২টিরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ পদ পদ শূন্য অবস্থায় রয়েছে। পদোন্নতির প্রক্রিয়া বন্ধ থাকায় এসব পদে অনেককে বাড়তি দায়িত্ব নিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে।
বিরোধের মূল সূত্রপাত
ঘটনার সূত্রপাত একই পঞ্জিকাবর্ষে বিসিএসের মাধ্যমে সরাসরি আসা সহকারী প্রকৌশলী এবং পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রকৌশলী হওয়া ডিপ্লোমাধারী কর্মকর্তাদের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণকে কেন্দ্র করে।
৩৭তম বিসিএস ও পদোন্নতি: ২০১৯ সালের ২০ মার্চ ৩৭তম বিসিএসের মাধ্যমে ৪৪ জন সহকারী প্রকৌশলী যোগ দেন। একই বছরের ৩০ ডিসেম্বর উপসহকারী প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতি পেয়ে ২৫ জন সহকারী প্রকৌশলী হন।
৩৮তম বিসিএস ও পদোন্নতি: ২০২১ সালের ২৭ জানুয়ারি ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে সিভিল ও তড়িৎ-যান্ত্রিক মিলিয়ে ৯৩ জন নিয়োগ পান। পরবর্তীতে ওই একই বছরের ২ নভেম্বর পদোন্নতি পান আরও ৫৩ জন উপসহকারী প্রকৌশলী।
যেখানে যুক্তি ও নিয়মের সংঘাত
দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে ১৯৭০ সালের জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণের সাধারণ নীতিমালার ভিত্তিতে একই পঞ্জিকাবর্ষে যারা আগে যোগদান করতেন, তাদেরই জ্যেষ্ঠ তালিকায় শীর্ষে রাখা হতো। তবে সরাসরি নিয়োগপ্রাপ্ত বিসিএস কর্মকর্তারা দাবি করেন—যোগদানের তারিখ নয়, বরং সার্কুলার বা বিজ্ঞপ্তির সময় থেকে তাদের জ্যেষ্ঠতা হিসাব করতে হবে।
বিষয়টি আদালতে গড়ালে হাইকোর্টের নির্দেশে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, অনুমোদিত জ্যেষ্ঠতার তালিকা ছাড়াই পদোন্নতি দেওয়ার ফলে ক্যাডার কর্মকর্তাদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়েছে এবং আদালত তা অবৈধ ঘোষণা করে। পরবর্তীতে আপিল বিভাগ স্পষ্ট জানায়, সরাসরি ক্যাডার পদে আসা প্রকৌশলীরা যোগদান করার আগের কোনো তারিখ থেকে জ্যেষ্ঠতা দাবি করতে পারবেন না। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে রিভিউ আবেদন করা হয়।
অন্যদিকে, পদোন্নতিপ্রাপ্ত নন-ক্যাডার বা ডিপ্লোমাধারী প্রকৌশলীরাও আলাদা রিট আবেদন করে ক্যাডার নিয়োগের কিছু বিষয়কে চ্যালেঞ্জ করেন। সরকার পক্ষ এর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিলে আদালত ওই রিটের ওপর স্থগিতাদেশ দেয়।
উভয়পক্ষের দাবি ও মন্ত্রণালয়ের অবস্থান
ক্যাডার কর্মকর্তাদের বক্তব্য: জ্যেষ্ঠতা, বিভাগীয় পরীক্ষা ও বিধিমালার সঠিক প্রয়োগ ছাড়া পদোন্নতি দিলে ভবিষ্যতে ক্যাডার কাঠামো ভেঙে পড়বে। ফলে ৩৭ থেকে ৪৪তম বিসিএসের অনেক যোগ্য কর্মকর্তা ৫-সাড়ে ৫ বছর ধরে একই পদে আটকে আছেন এবং ৯ম থেকে ৬ষ্ঠ গ্রেডে যেতে পারছেন না।
পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের বক্তব্য: প্রায় সাড়ে চার দশক ধরে যে নীতিমালায় জ্যেষ্ঠতা নির্ধারিত হয়ে আসছে, হঠাৎ করে তাতে পরিবর্তন আনা গ্রহণযোগ্য নয়।
মন্ত্রণালয়ের অবস্থান: মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সারোয়ার আলম জানিয়েছেন, হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ ও একাধিক আইনি জটিলতার কারণে চূড়ান্ত জ্যেষ্ঠতার তালিকা প্রণয়ন করা যাচ্ছে না। এক পক্ষকে পদোন্নতি দিলে অন্য পক্ষ পুনরায় আদালতের দ্বারস্থ হবে। তাই আদালত থেকে মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিবে না।
আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় ঝুলে থাকা এই জ্যেষ্ঠতার তালিকার কারণে পদোন্নতিপ্রত্যাশী কর্মকর্তাদের মধ্যে যেমন হতাশা বাড়ছে, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে কর্মকর্তা সংকটে কাজের গতি ব্যাহত হচ্ছে।
অনলাইন ডেস্ক 

























