Dhaka ০৭:৫৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
জাপানি ‘ও-সোজি’ মডেলে ঢাকার ২১ বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ পাইলট প্রকল্প শুরু ভাঙ্গায় যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত: সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য প্রতিহত করার আহ্বান দেশে আর কোনো গুম-বিচারবহির্ভূত হত্যা দেখতে চায় না সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেমিট্যান্স আহরণ ও সেবা আরও সহজ করতে ওয়ান ব্যাংকের সাথে নগদের কৌশলগত চুক্তি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও থামেনি বিএডিসির বীজ সিন্ডিকেট: বহাল তবিয়তে ‘বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক’ মিরপুরে ডিএনসিসির বড় অভিযান: গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো দুই হাজার অবৈধ দোকান বন বিভাগে ‘পে-ফিক্সেশন’ বাণিজ্য: ফাইলপ্রতি ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ, জিম্মি সাধারণ কর্মচারীরা পঞ্চগড় বোদা ভূমি অফিসে ঘুষ বাণিজ্য: তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ভিডিও ভাইরালের পর ক্ষোভ কুড়িগ্রাম সদর খাদ্যগুদামে ২ কোটি টাকার চাল ও ধান আত্মসাৎ: দুদকের মামলা চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জে মেঘনা নদীতে অভিযান: ১ লাখ মিটার জাল ও ২৫০ কেজি ইলিশসহ আটক ৩

গণপূর্তে আসবাব সরবরাহে হাতিলের অঘোষিত আধিপত্য

  • Reporter Name
  • আপডেট টাইম : ০১:৩০:০০ অপরাহ্ন, বুধবার, ১ জুলাই ২০২৬
  • ৭২ বার

সরকারি স্থাপনায় আসবাবপত্র ও ইন্টেরিয়র সরবরাহ খাতে দীর্ঘদিন ধরে একটি প্রতিষ্ঠানের অস্বাভাবিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠেছে। বঙ্গভবন, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, জেলা হাসপাতাল, আদালত ভবন, সার্কিট হাউস, মডেল মসজিদ, প্রশাসনিক ভবনসহ গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতায় বাস্তবায়িত বড় বড় প্রকল্পে বারবার একই প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক প্রভাবের সুযোগ নিয়ে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড সরকারি আসবাব সরবরাহের বাজারে অঘোষিত একচ্ছত্র অবস্থান তৈরি করে। প্রতিষ্ঠানটির মহাব্যবস্থাপক খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে সরকারি প্রকল্পকে কেন্দ্র করে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০২৬ সালে দেশের জেলা হাসপাতালগুলোকে ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও সংস্কার প্রকল্পের আওতায় গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম কাঠের কারখানা বিভাগ মোট ১২টি পৃথক দরপত্র আহ্বান করে। গত ৮ জুন পর্যন্ত অনুষ্ঠিত দরপত্র মূল্যায়নে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেড ১২টির মধ্যে ৮টিতে সর্বনিম্ন দরদাতা হিসেবে নির্বাচিত হয়। তবে মূল্যায়ন শেষ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র একটি কাজের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। বাকি সাতটি কার্যাদেশ অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, কার্যাদেশ আটকে যাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে তদবির শুরু হয়। এমনকি কার্যাদেশ দ্রুত দেওয়ার জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের কাছে লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের কোম্পানি সেক্রেটারি মো. রেজাউল করিম গণপূর্ত অধিদপ্তরের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (ই/এম) জোন আশ্রাফুল হকের কাছে লিখিত আবেদন করেন। একই আবেদন জেলা হাসপাতাল উন্নয়ন প্রকল্পের পরিচালক, প্রধান প্রকৌশলী, অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছেও পাঠানো হয়। অভিযোগে নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের কথা উল্লেখ করা হয়। তবে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই না করেই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই বড় বড় সরকারি প্রকল্পে হাতিলের উপস্থিতি লক্ষণীয়। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মডেল মসজিদ প্রকল্প, সার্কিট হাউস, আদালত ভবন এবং অন্যান্য সরকারি স্থাপনায় আসবাবপত্র সরবরাহের কাজে প্রতিষ্ঠানটির ধারাবাহিক অংশগ্রহণ নিয়ে অতীতেও প্রশ্ন উঠেছে। সরকারি ক্রয় আইনের মূল উদ্দেশ্য প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করা হলেও বাস্তবে একই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক সাফল্য অনেকের কাছেই অস্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গণপূর্ত অধিদপ্তরের একজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী দাবি করেন, হাতিলের সঙ্গে অধিদপ্তরের কয়েকজন প্রকৌশলীর দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তার ভাষ্য, প্রথম দিকে কিছু প্রকল্পে প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার শর্ত পূরণের জন্য ভুয়া কাজের কাগজপত্র ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটিকে সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ধীরে ধীরে বড় প্রকল্পগুলোতে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি আরও অভিযোগ করেন, নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে শুরু করে ঊর্ধ্বতন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রভাবিত করার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, হাতিল শুধু দরপত্রে অংশ নিয়েই ক্ষান্ত থাকেনি; কার্যাদেশ আটকে গেলে প্রশাসনিক চাপ সৃষ্টি করারও চেষ্টা করেছে। একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বছরের পর বছর সরকারি কাজের বড় অংশ পাওয়ার অভিযোগ থাকার পরও কার্যাদেশ না পেয়ে বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগপত্র পাঠানো সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা কি না—সেটিও প্রশ্ন হিসেবে সামনে এসেছে।
এ বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ই/এম বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জোবায়ের বিন হায়দার বলেন, দরপত্র মূল্যায়নের কাজ এখনও চলমান। চূড়ান্ত অনুমোদন ছাড়া কোনো কার্যাদেশ দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারি বিধি অনুসারেই সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হচ্ছে। তিনি নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও অস্বীকার করেন।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে হাতিল কমপ্লেক্স লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক খোরশেদ আলমের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একটি প্রতিষ্ঠান যদি দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি টেন্ডারের উল্লেখযোগ্য অংশ পায়, তাহলে বিষয়টি অবশ্যই গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত। তার মতে, একচেটিয়া কাজ স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার প্রতিটি ধাপে জবাবদিহি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সুশাসন বিশ্লেষক জান্নাতুর রহমান বলেন, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় প্রকৃত প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে দরপত্র মূল্যায়ন, কার্যাদেশ প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে স্বচ্ছতা থাকতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রভাব খাটানো বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় একই প্রতিষ্ঠানের ধারাবাহিক আধিপত্য, একাধিক মেগা প্রকল্পে পুনরাবৃত্ত অংশগ্রহণ, কার্যাদেশকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক তৎপরতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ—সব মিলিয়ে বিষয়টি এখন বিস্তৃত তদন্তের দাবি রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত এক দশকে গণপূর্ত অধিদপ্তরের আওতায় আসবাবপত্র সরবরাহসংক্রান্ত সব বড় প্রকল্প, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা, দরপত্র মূল্যায়নের নথি, কার্যাদেশ এবং কাজ বাস্তবায়নের তথ্য স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা হলে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় কোনো বিশেষ সুবিধার বলয় তৈরি হয়েছিল কি না, তার প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোচিত

জাপানি ‘ও-সোজি’ মডেলে ঢাকার ২১ বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ পাইলট প্রকল্প শুরু