
ভিআইপি সফরকে কেন্দ্র করে তাড়াহুড়ো করে করা সংস্কারকাজের স্থায়িত্ব নিয়ে ফের বড় ধরনের প্রশ্ন উঠেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রংপুর সফরের মাত্র এক সপ্তাহ আগে তড়িঘড়ি করে মেরামত করা রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের একটি অংশ এক সপ্তাহ পার না হতেই আবারও ভেঙে চৌচির হয়ে গেছে। নতুন বসানো সিমেন্টের ব্লক গুঁড়িয়ে যাওয়ার পাশাপাশি উঠে গেছে পিচের আস্তরণ। ফলে সম্প্রতি সংস্কার করা অংশটিতে পুনরায় বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে এবং বাধ্য হয়ে দ্বিতীয় দফায় জোড়াতালির কাজ শুরু করতে হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত এই অংশটি রংপুর-দিনাজপুর মহাসড়কের পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত প্রায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ পথের মধ্যে পড়েছে। এর মধ্যে অন্তত দুই কিলোমিটারজুড়ে সংস্কারের পরও সড়কের নাজুক চিত্র বজায় রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ২০ অক্টোবর শারদীয় দুর্গোৎসব পরিদর্শনে প্রধানমন্ত্রী রংপুর আসেন। ওই সফরকে সামনে রেখে আগের চার দিন ধরে মহাসড়কের শতাধিক ভাঙাচোরা অংশে তড়িঘড়ি করে মেরামতকাজ চালানো হয়। সে সময় পুরোনো ইটের পাটাতন তুলে নতুন সিমেন্টের ব্লক বসানোর পর তার ওপর পিচের প্রলেপ দেওয়া হয়েছিল।
তবে কাজ চলাকালেই এর স্থায়িত্ব নিয়ে তীব্র সংশয় প্রকাশ করেছিলেন চালক, পথচারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা। শেষ পর্যন্ত তাঁদের সেই আশঙ্কাই সত্যি হলো।
গত শনিবার (২৪ অক্টোবর) সরেজমিনে দেখা যায়, সদ্য মেরামত করা একাধিক পয়েন্টে ব্লক ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে গেছে। কোথাও পিচ সম্পূর্ণ উঠে গিয়ে আগের মতো বিপজ্জনক গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এসব স্থানে এখন পুনরায় মেরামতের কাজ চলছে।
হাজীপাড়া মোড়ের ব্যবসায়ী রাকিব ইসলাম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “মাত্র সাত দিন আগে ইটের পাটাতন তুলে এখানে সিমেন্টের ব্লক বসানো হয়েছিল। কিন্তু নিম্নমানের কাজের কারণে সেগুলো এখন গুঁড়ো হয়ে গেছে। এখন আবার নতুন করে ঠিক করা হচ্ছে। আমরা স্থায়ী ও টেকসই সমাধান চাই।”
নিয়মিত যাতায়াতকারী বাসচালক আব্দুর রশিদ বলেন, “পাগলাপীর থেকে মেডিকেল মোড় পর্যন্ত রাস্তার অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। মানসম্মত কাজ না হওয়ায় সড়ক বারবার ভেঙে যাচ্ছে এবং এখানে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে।”
এই মহাসড়কের সংস্কারকাজ নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়। সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৭ কিলোমিটার সড়ক সংস্কারের কাজ পেয়েছিল রাজশাহীর ‘ডন এন্টারপ্রাইজ’। যার চুক্তিমূল্য ছিল প্রায় ২৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা। ওই সময় ৪ ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে ডিবিএসটি পদ্ধতিতে কাজ শেষ করা হলেও তখনই মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
অভিযোগ রয়েছে, সে সময় টহলে থাকা সেনাবাহিনীর একটি দল দেখতে পায় যে, প্রতি বর্গমিটারে নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে ৫ কেজি করে কম পাথর ব্যবহার করা হয়েছে। সব মিলিয়ে প্রায় ৩৬৫ টন পাথর কম দেওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। কাজ শেষ হওয়ার আগেই কার্পেটিং উঠে গর্তের সৃষ্টি হওয়ায় পরবর্তীতে ইট দিয়ে তা ভরাট করা হয়েছিল, যা জনগণের ভোগান্তি আরও বাড়িয়ে দেয়।
বারবার কেন একই সড়ক ভেঙে পড়ছে—এমন প্রশ্নের জবাবে রংপুর সওজের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মো. কামাল পাশা একরকম অসহায়ত্ব প্রকাশ করেন। তিনি জানান, মেরামত করার পরও কাজ টেকানো যাচ্ছে না। ইট ভেঙে যাওয়ায় ব্লক বসানো হলেও সেই ব্লকও টিকছে না।
তিনি আরও বলেন, “অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচল এর একটি কারণ হতে পারে, তবে মূল সমস্যা হলো সড়কের নিচের ভিত্তি বা ফাউন্ডেশন দুর্বল হয়ে যাওয়া। ফাউন্ডেশন নষ্ট হয়ে গেলে ওপরে যতই প্যাচওয়ার্ক করা হোক না কেন, কোনো লাভ হয় না। এই অবস্থায় সড়কটি নতুন করে নির্মাণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।”
বিশেষজ্ঞ ও স্থানীয়দের মতে, সড়কের ভিত্তি দুর্বল রেখে ওপরের স্তরে বারবার জোড়াতালি দেওয়া কেবল সরকারি অর্থের অপচয়। প্রধানমন্ত্রী বা ভিআইপি সফর এলেই স্বল্প সময়ে লোক দেখানো মেরামতের প্রবণতা থেকে বেরিয়ে এসে এই ব্যস্ত মহাসড়কটি স্থায়ীভাবে নতুন করে নির্মাণ করা জরুরি। একই সঙ্গে কাজের মান যাচাই এবং অতীতে অনিয়মের সাথে জড়িতদের যথাযথ জবাবদিহির আওতায় আনার জোরালো দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















