
চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের ঐতিহ্যবাহী চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য এখন চরম অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু অসাধু বন কর্মকর্তার সীমাহীন দুর্নীতি, অনিয়ম ও লুটপাটের কারণে দেশের অন্যতম প্রাচীন এই বনাঞ্চল আজ ধ্বংসের মুখে। এই পুরো অপকর্মের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন চুনতি রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার আবির হাসান এবং একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট।
চাকরি লাভ থেকে বেপরোয়া হয়ে ওঠা
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২৪ সালের মার্চ মাসে চাকরিতে যোগ দেওয়া রেঞ্জার আবিরের বাড়ি মাগুরা জেলায়। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক সরকারের প্রভাবশালী এক সংসদ সদস্যকে মোটা অংকের উৎকোচ দিয়ে বিতর্কিত সুপারিশের মাধ্যমে তিনি বন অধিদপ্তরে চাকরি বাগিয়ে নেন। যোগদানের পর থেকেই কাঠ পাচার, অবৈধ বালু উত্তোলন, সংরক্ষিত বনের জমি বিক্রি এবং পাহাড় কাটার মতো গুরুতর অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়েন তিনি। গণমাধ্যমে একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশ পেলেও বন অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা না নেওয়ায় তার বেপরোয়া আচরণ আরও বেড়ে গেছে।
চার বিটে চলছে অনিয়মের মহোৎসব
রেঞ্জার আবিরের প্রত্যক্ষ মদদে চুনতি রেঞ্জের সাতগড়, হারবাং, বড়ইতলী ও বড় হাতিয়া বিটে চলছে বনাঞ্চল ধ্বংসের নজিরবিহীন উৎসব। বনদস্যু ও ভূমিগ্রাসীদের নিয়মিত ‘সাপ্তাহিক টোকেন’ বা বিশেষ স্লিপ দিয়ে এসব অপরাধ পরিচালনা করা হয়। এই অবৈধ বাণিজ্যের একটি বড় অংশ চলে যায় চট্টগ্রাম দক্ষিণ বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক (এসিএফ) দেলোয়ার হোসেন এবং বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোহাম্মদ সোহেল রানার পকেটে।
প্রকল্পের অর্থ লোপাট ও ভুয়া বিল-ভাউচার
বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ‘সুফল’ (SUFAL) প্রকল্পের মাধ্যমে পরিবেশ ও বন পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও রেঞ্জার আবিরের গাফিলতিতে তা ভেস্তে গেছে। এছাড়া, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বন্য হাতির খাদ্য সংকট নিরসন ও বাগান সৃজনের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ কোনো দৃশ্যমান কাজে ব্যবহার করা হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, ডিএফও সোহেল রানা ও রেঞ্জার আবির হাসান পরস্পর যোগসাজশে শতভাগ ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে এই সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করেছেন।
অভ্যন্তরীণ কর্মচারীদের তথ্যমতে, বরাদ্দের ৫৫ শতাংশ টাকাই ডিএফও ও রেঞ্জ কর্মকর্তা নিজেদের মধ্যে ভাগবাটোয়ারা করে নেন। মাঠপর্যায়ের বিট কর্মকর্তাদের নামমাত্র ৪৫ শতাংশ দেওয়া হলেও ঠিকাদারি কাজের কোনো অর্থই তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। বনভূমি ড্রোন বা ফিতা দিয়ে পরিমাপ করলেই এই বিশাল দুর্নীতির সত্যতা মিলবে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
পরিবেশগত বিপর্যয় ও বন্য হাতির সংকট
সংরক্ষিত বন উজাড় ও হাতির চলাচলের ঐতিহাসিক করিডোর ধ্বংস হওয়ার কারণে অভয়ারণ্যে খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। ফলে দলছুট এশীয় হাতির পাল প্রায়ই লোকালয়ে হানা দিচ্ছে, যার ফলে মানুষ ও হাতির সংঘাত দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে, পাহাড়ি ছড়া থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন ও পাহাড় কাটার ফলে প্রাকৃতিক জলাধার নষ্ট হচ্ছে এবং গভীর গর্তে পড়ে বন্য হাতির শাবকের মৃত্যুর মতো মর্মান্তিক ঘটনাও ঘটছে।
বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইন লঙ্ঘন করে চলা এই ধ্বংসলীলা অবিলম্বে বন্ধ করতে এবং দুর্নীতিবাজ রেঞ্জার আবির হাসান ও ডিএফও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে নিরপেক্ষ তদন্ত ও কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও পরিবেশবাদীরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















