
রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন খাতের মতো কৃষি খাতেও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য থামেনি। বিগত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও সচিবদের নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নেওয়া একটি চক্র বর্তমানে খোলস পাল্টে নতুন পরিচয়ে বহাল তবিয়তে বিএডিসির কোটি কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নিচ্ছে। সব ধরনের অনিয়ম ও কেলেঙ্কারী সত্ত্বে ‘বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে বারবার কাজ পাইয়ে দেওয়ার নেপথ্যে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) দুই উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক ও সাবেক সচিব ওয়াহিদা আক্তারের ঘনিষ্ঠদের নিয়ে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বীজ আমদানির নামে অনিয়ম চালিয়ে আসছে। সে সময় সাবেক এমপি মাশরাফি বিন মর্তুজার আত্মীয় পরিচয়দানকারী কৃষিবিদ জিল্লুর রহমান মন্ত্রীর নাম ব্যবহার করে খামারবাড়ি ও বিএডিসির কাজ নিয়ন্ত্রণ করতেন। তার আত্মীয়ের প্রতিষ্ঠান ‘বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক’-এর মাধ্যমেই মূলত ভারত থেকে নিম্নমানের ও ভেজাল ভুট্টা, সূর্যমুখী এবং পেঁয়াজ বীজ (এন-৫০) আমদানি করা হয়, যা বপন করে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ কৃষকরা।
তবে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এই চক্রটি রাতারাতি নিজেদের খোলস পাল্টে ফেলেছে। ভারতীয় কাবেরী সিড কোম্পানির প্রতিনিধি অমিত দাস এবং বঙ্গ অ্যাগ্রিটেকের ব্যবসায়িক পার্টনারের নেতৃত্বে গঠিত এই চক্রটি বর্তমানে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নাম ভাঙিয়ে কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে। আওয়ামী শাসনামলে শত কোটি টাকার কাজ নেওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি গত দুই মাসেই বিএডিসি থেকে প্রায় ৯ থেকে ১০ কোটি টাকার কাজ হাতিয়ে নিয়েছে।
কোম্পানির পরিচালক নাজমুল কবির রাসেল বর্তমানে নিজেকে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের সমর্থক হিসেবে দাবি করলেও নথিপত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। প্রতিষ্ঠানের অফিশিয়াল স্মারকলিপিতে (মেমোরেন্ডাম) তার নামের কোনো উল্লেখ না থাকায় প্রশ্ন উঠেছে যে, বিগত সরকারের আমলেও তিনি অন্য কারও কোম্পানির মালিক সেজে মিথ্যাচারের মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছিলেন কি না। বর্তমানেও রাজনৈতিক পরিচয় বদল করে তিনি বিএডিসি ও ডিএই-এর বীজ সরবরাহসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণ করছেন। এছাড়া তাদের আমদানিকৃত কীটনাশকের মান নিয়েও মারাত্মক অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারি অনুমোদন পাওয়ার পরও বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক সময়মতো কৃষকদের হাতে বীজ পৌঁছে দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। চলতি মৌসুমে মেহেরপুর ও মুজিবনগর অঞ্চলের চাষিদের জন্য বরাদ্দ করা ৭ টন বীজ এখনো কৃষকদের হাতে পৌঁছায়নি। মৌসুম শেষ হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় কৃষকরা চরম বিপাকে পড়েছেন। মেহেরপুরের মোনাখালী গ্রামের কৃষক জাকির হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, সময় পার হয়ে যাওয়ার পর এই বীজ পাওয়ার আর কোনো উপযোগিতা নেই। এদিকে মেহেরপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সামসুল আলমও মানহীনতার কারণে বীজ ফেরত পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মাধ্যমে ক্ষুদ্র পরিসরে বীজ সরাসরি সংগ্রহের সুযোগ নিয়ে এই সিন্ডিকেট স্থানীয় বাজার থেকে নিম্নমানের বীজ কিনে সরবরাহ করছে। এতে ঠিকাদাররা লাভবান হলেও প্রতারিত হচ্ছেন কৃষকরা। জাতীয় দৈনিকে পেঁয়াজ বীজ ক্রয়ে অনিয়মের খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও বিএডিসির ‘ধান, গম ও ভুট্টার উন্নততর বীজ উৎপাদন ও উন্নয়ন প্রকল্প’-এর প্রকল্প পরিচালক মো. হুমায়ুন কবির এবং যুগ্ম পরিচালক মো. জুলফিকারের প্রত্যক্ষ সহায়তায় প্রতিষ্ঠানটি একের পর এক কাজ পাচ্ছে। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তা মুঠোফোন রিসিভ করেননি।
কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান জানিয়েছেন, বীজ নিয়ে যেকোনো অনিয়ম রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। তবে কৃষিবিদদের মতে, বিএডিসির ভেতরের এই অসাধু কর্মকর্তা এবং বঙ্গ অ্যাগ্রিটেকের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অবিলম্বে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা না নিলে সরকারের প্রণোদনার মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত হবে এবং লক্ষ্যমাত্রানুযায়ী ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়ে চরম ক্ষতির মুখে পড়বেন দেশের কৃষকরা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















