
যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদন না থাকা, মাস্টারপ্ল্যানের শর্ত ভঙ্গ এবং জমির মালিকানা নিয়ে বহুমুখী আইনি জটিলতার কারণে পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় আলোচিত ‘ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট’ প্রকল্পের নির্মাণকাজ বন্ধ করে দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন। মঙ্গলবার দুপুরে কুয়াকাটা পৌরসভা ও কলাপাড়া উপজেলা প্রশাসন যৌথ অভিযান চালিয়ে নির্মাণকাজ স্থগিত করে এবং সেখানে নিষেধাজ্ঞাসংক্রান্ত একটি সতর্কতামূলক ব্যানার টাঙিয়ে দেয়।
কুয়াকাটা সৈকত ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্যসচিব ও কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আরিফুজ্জামান এবং পৌরসভার প্রশাসক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. ইয়াসীন সাদেকের নেতৃত্বে এই অভিযান পরিচালিত হয়।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, কুয়াকাটার অনুমোদিত মাস্টারপ্ল্যান অনুযায়ী নির্ধারিত জমিটি মূলত রেলওয়ের স্থাপনার জন্য বরাদ্দ। এছাড়া কোনো ধরনের বৈধ অনুমোদন ছাড়া ভবন নির্মাণ আইনগতভাবে দণ্ডনীয় অপরাধ। বর্তমান বিএস জরিপ অনুযায়ী জায়গাটি কুয়াকাটা পৌরসভার আওতাধীন। টাঙিয়ে দেওয়া ব্যানারে অনুমোদনহীন এই স্থাপনা নির্মাণের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটির প্রচারণায় ৩০ বিঘা জমির ওপর বিশাল এই রিসোর্ট গড়ে তোলার কথা বলা হলেও অনুসন্ধানে ব্যাপক অসংগতির তথ্য বেরিয়ে এসেছে। পৌরসভায় জমা দেওয়া নথিপত্র অনুযায়ী জমির পরিমাণ দেখানো হয়েছিল মাত্র ১ দশমিক ৯২ একর (প্রায় ৫ দশমিক ৭৪ বিঘা)। গত ৭ জানুয়ারি নামমাত্র এই জমির বিপরীতে প্রাথমিক অনুমোদন নেওয়া হলেও, এর প্রায় ছয় মাস আগেই ৩০ বিঘার বড় প্রকল্পের কথা বলে শেয়ার বিক্রি শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির দাবি—তারা ২১ বিঘা জমি কিনেছে এবং বাকি ৯ বিঘার বায়না করেছে। তবে এর সপক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট দলিল বা বৈধ কাগজপত্র তারা দেখাতে পারেনি।
প্রকল্পটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডি এম এমদাদুল হক ১৬ জনের কাছ থেকে ১৭ দশমিক ৫৫৯ বিঘা জমির বায়না দলিল করলেও এসব জমির মালিকানা নিয়ে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে। খেপুপাড়া সাবরেজিস্ট্রি অফিসের শর্ত অনুযায়ী, বরিশালের বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে অনুমতি পাওয়ার পরই কেবল এসব জমি হস্তান্তর করা সম্ভব। ফলে বায়না করা সম্পত্তিকে নিশ্চিত মালিকানাধীন জমি দেখিয়ে শেয়ার বিক্রির পরিকল্পনা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়েছে।
অন্যদিকে, জমির প্রকৃত মালিকানা দাবি করে স্থানীয় চার বাসিন্দা পটুয়াখালীর যুগ্ম জেলা জজ আদালতে দেওয়ানি মামলা করেছেন। পাশাপাশি, কুয়াকাটার হাড়িপাড়া রাখাইন পল্লির বাসিন্দারা সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেছেন যে, তাদের পূর্বপুরুষদের সিএস, আরএস ও এসএ খতিয়ানের জমির ওপর জোরপূর্বক সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হচ্ছে। এ বিষয়ে রাখাইন সম্প্রদায়ের পক্ষে ল্যান্ড সার্ভে ট্রাইব্যুনালে একটি মামলাও দায়ের করা হয়েছে, যেখানে ৮৭ জনকে আসামি করা হয়েছে। যদিও হোটেল কর্তৃপক্ষ রাখাইনদের এই দাবি অস্বীকার করেছে।
সব ধরনের আইনি বিরোধ ও অনুমোদনের বিষয়টি অমীমাংসিত রেখেই প্রতিষ্ঠানটি আগ্রাসীভাবে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালিয়ে গেছে। প্রকল্পটিকে ৪৩ হাজার শেয়ারে ভাগ করে ২৬ হাজার প্যাকেজের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কাছে প্রচার চালানো হয়। তাদের দাবি, প্রায় ১০ হাজার প্যাকেজে ইতিমধ্যে ২২ হাজার শেয়ার বিক্রিও হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিনিয়োগকারীরা পূর্ণাঙ্গ দলিলপত্র বা অনুমোদন যাচাই না করেই প্রখ্যাত ব্যক্তিত্বদের নামে আকৃষ্ট হয়ে বিনিয়োগ করছেন। প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে প্রয়াত দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছেলে এবং পিরোজপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মাসুদ সাঈদীকে চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং প্রকল্পটিকে ‘হালাল ট্যুরিজম’ হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে। তবে এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুয়াকাটার মতো একটি সংবেদনশীল পর্যটনকেন্দ্রে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে আইনি স্বচ্ছতা, জমির প্রকৃত মালিকানা এবং যথাযথ অনুমোদন নিশ্চিত করা অপরিহার্য। ইস্তানবুল হোটেল অ্যান্ড রিসোর্ট প্রকল্পের ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা মেনে বৈধ কাগজপত্র সংগ্রহ, জমি সংক্রান্ত আইনি বিরোধের অবসান এবং সাধারণ বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষার ওপর।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















