
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) অধীন কাস্টমস বন্ড কমিশনারেট, ঢাকা (উত্তর)-এর কমিশনার মিয়া মো. আবু ওবায়দাকে ঘিরে উঠেছে শত কোটি টাকার বন্ড কারসাজি, জাল দলিল তৈরি, রাজস্ব ফাঁকি এবং প্রশাসনিক প্রভাব খাটানোর গুরুতর অভিযোগ। দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরগুলোতে দায়িত্ব পালনকে কেন্দ্র করে এনবিআরের অভ্যন্তরে তার প্রভাব ও অবস্থান নিয়েও চলছে বিস্তর আলোচনা।অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিসিএস ২২তম ব্যাচের কর্মকর্তা মিয়া মো. আবু ওবায়দা ২০০৩ সালে সহকারী কমিশনার হিসেবে বন্ড কমিশনারেটে যোগ দেন। পরবর্তীতে আইসিডি কমলাপুর, এনবিআর সচিবালয়, সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং বন্ড কমিশনারেটের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেন। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, প্রশাসনিক প্রভাব ও রাজনৈতিক যোগাযোগের কারণে তাকে কখনো ঢাকার বাইরে বদলি করা হয়নি।সম্প্রতি মো. আক্তার উজ জামান নামে এক ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে বলা হয়, কূটনৈতিক বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের ঘুষ আদায় করা হতো। এ কাজে ‘ফরিদ’ ও জামান এক্সেসরিজের মালিক জামানের নামও উঠে এসেছে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম ভ্যাটের কর্মকর্তা এ.বি.এম মাসুমকে বিশেষ প্রভাব খাটিয়ে নিজের দপ্তরে আনার অভিযোগও রয়েছে।দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভাষ্যমতে, ধর্মীয় ভাবমূর্তি ও বাহ্যিক উপস্থিতির কারণে অফিসে আবু ওবায়দা “বন্ড হুজুর” নামে পরিচিত। তবে অভিযোগ উঠেছে, এই ভাবমূর্তির আড়ালে তিনি বন্ড সুবিধাকেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন, যার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে নিয়ন্ত্রণ ও প্রভাব বজায় রাখা হয়েছে।অভিযোগের সবচেয়ে আলোচিত অংশ বন্ড কমিশনারেট ভবনের নিচতলায় পরিচালিত একটি ফটোকপির দোকানকে ঘিরে। অভিযোগ রয়েছে, ওই দোকান থেকেই জাল ইউটিলাইজেশন পারমিশন (ইউপি) ও ভুয়া বন্ড দলিল তৈরি করা হতো। এর মাধ্যমে মাহমুদ গ্রুপ ও ডংবেং গ্রুপসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শত কোটি টাকার রাজস্ব ফাঁকির ঘটনা ধামাচাপা দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়।অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, দোকানটিতে একাধিক কম্পিউটার ও ফটোকপি মেশিন ব্যবহার করে নথি প্রস্তুত ও সত্যায়নের কাজ চলত। এমনকি সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ইমরান হাসানকে অফিস কক্ষের বাইরে ওই দোকানে নথিপত্র সত্যায়ন করতে দেখা গেছে বলেও অভিযোগ উঠেছে।এদিকে, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশের পর তা সরিয়ে ফেলতে তৎপরতা চালানোর অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বন্ড কমিশনারেটের কয়েকজন কর্মকর্তা প্রতিবেদকদের ফোন করে সংবাদ প্রকাশ বন্ধ বা সরিয়ে নিতে চাপ দেন এবং অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাবও করেন। এমনকি কয়েকজন সাংবাদিককে তদবিরের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।অভিযোগ ও অনুসন্ধানের তথ্য সামনে এলেও আবু ওবায়দার প্রশাসনিক প্রভাব কমেনি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। সম্প্রতি এক দাপ্তরিক আদেশে তাকে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, ঢাকা উত্তরের কমিশনারের দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে। এতে এনবিআরের অভ্যন্তরে তার প্রভাব ও ‘অদৃশ্য শক্তি’ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।অন্যদিকে, একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বন্ড সুবিধায় আনা বিপুল পরিমাণ কাঁচামালের হদিস পাওয়া যাচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, এসব কাঁচামাল শুল্ক ফাঁকি দিয়ে খোলাবাজারে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। তদন্তে বন্ড সুবিধার অপব্যবহারের প্রমাণও মিলেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।অনুসন্ধান সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, কমিশনার মিয়া মো. আবু ওবায়দার যোগসাজশে দীর্ঘদিন ধরে সরকার কোটি কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছে দেশের অর্থনীতি ও বৈধ ব্যবসায়িক পরিবেশ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















