
অস্ত্রের ঝনঝনানিতে আতঙ্কের জনপদে পরিণত হয়েছে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। কখনো স্বার্থে আঘাত কিংবা তুচ্ছ ঘটনা বা আধিপত্য বিস্তার নিয়ে কথায় কথায় প্রকাশ্যে আনা হচ্ছে আগ্নেয়াস্ত্র। ট্রিগার চেপে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তরতাজা প্রাণ। প্রকাশ্যে একের পর এক রোমহর্ষক ঘটনা ঘটলেও সিংহভাগ ক্ষেত্রেই ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকছে অস্ত্রধারীরা।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, চট্টগ্রামের বেশির ভাগ এলাকায় চলছে প্রকাশ্য অস্ত্রের মহড়া। পাড়ার মোড়ে আড্ডায়, চাঁদাবাজির ভাগ-বাঁটোয়ারা, টেন্ডারবাজি, কিশোর গ্যাংয়ের বিরোধ কিংবা রাজনৈতিক মাঠে পেশিশক্তির মহড়া-সবখানেই এখন অস্ত্রের দাপট। একসময় কেবল দেশীয় অস্ত্রের ব্যবহার থাকলেও এখন সন্ত্রাসীদের হাতে শোভা পাচ্ছে অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল ও রিভলবার। এলাকাভিত্তিক আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে এক গ্রুপ আরেক গ্রুপের ওপর বিনা দ্বিধায় গুলি চালাচ্ছে। অস্ত্রের এসব মহড়ার নেপথ্যে ঘুরেফিরে আসছে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার অন্তত ২০ জন সন্ত্রাসী ও তাদের বাহিনীর নাম। এসব দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীর পেছনে রয়েছে কিছু অসাধু রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের অদৃশ্য ছায়া। এই গডফাদাররাই মূলত নিজেদের স্বার্থ হাসিল, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল এবং অবৈধ টাকার পাহাড় গড়তে এই অস্ত্রধারীদের পুষছে।
আরও জানা যায়, চট্টগ্রামে ব্যবহৃত আগ্নেয়াস্ত্রের সিংহভাগ উৎসই হচ্ছে বাংলাদেশ-ভারত-মিয়ানমারের কুখ্যাত ব্ল্যাক ট্রায়াঙ্গেল। কক্সবাজার, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির কিছু দুর্গম সীমান্ত এলাকা ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশ থেকে অবৈধ অস্ত্রের চালান ঢুকছে। সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত সুকৌশলে এই অস্ত্রগুলো সমতলে নিয়ে আসছে। এসব অবৈধ অস্ত্র কেনাবেচার সিংহভাগ লেনদেন হচ্ছে হুন্ডি এবং ডার্ক ওয়েবভিত্তিক যোগাযোগের মাধ্যমে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি এড়ানো তাদের জন্য সহজ হচ্ছে।
গত ২২ জুন নগরীর কালুরঘাট ভারী শিল্প এলাকায় চাঁদার দাবিতে অস্ত্রের মহড়া দেয় সন্ত্রাসীরা। ১৩ জুন রাউজানে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় যুবদল নেতা মাসুদুল হক চৌধুরীকে। ৮ মে বায়েজিদে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় হাসান রাজু নামের এক ব্যক্তিকে। ১০ কোটি টাকা চাঁদা দাবি করে না পেয়ে ২৮ ফেব্রুয়ারি পুলিশ পাহারার মধ্যেই সাবেক এমপি ও চট্টগ্রামের শীর্ষ ব্যবসায়ী মুজিবুর রহমানের নগরীর বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালিয়েছে সন্ত্রাসীরা। এর আগে ২ জানুয়ারি মুজিবুরের বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। ২৫ ফেব্রুয়ারি রাউজানে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় আবদুল মজিদ নামের এক ব্যক্তিকে। ১১ ফেব্রুয়ারি রাউজান উপজেলার কদলপুরে চাঁদার দাবিতে এক প্রবাসীর বাসা লক্ষ্য করে গুলি করেছে সন্ত্রাসীরা। গত বছরের ১৬ ডিসেম্বর বায়েজিদ থানা এলাকায় চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় ছাত্রদল নেতা আহমেদ রেজার বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি করে সন্ত্রাসীরা। ২০ আগস্ট চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলায় চাঁদা না পেয়ে জাহাঙ্গীর আলম নামের এক আবাসন ব্যবসায়ীর বাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালায় সন্ত্রাসীরা।
তবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দাবি, অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধারের সংখ্যা বিগত যেকোনো সময়ের চেয়ে বেড়েছে। পুলিশের পরিসংখ্যানমতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২৮ জুন পর্যন্ত চট্টগ্রাম অঞ্চলে (চট্টগ্রাম রেঞ্জ ও সিএমপি) ৩৫০টির মতো আগ্নেয়াস্ত্রসংক্রান্ত মামলা দায়ের হয়েছে থানাগুলোতে। ২০২৫ সালে এ সংখ্যা ছিল ৬২৪টি। ২০২৪ সালে ৫৪৮টি আগ্নেয়াস্ত্রসংক্রান্ত মামলা দায়ের করা হয়। এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি) কমিশনার হাসান মোহাম্মদ শওকত আলী বলেন, ‘অবৈধ অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে আমাদের অভিযান চলছে। অনেকে গ্রেপ্তারও হয়েছেন। অভিযানের পরিসর আরও বিস্তৃত আকারে করার পরিকল্পনা চলছে। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যে আরও বড় সাফল্য দেখাতে পারব।’
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























