
নরসিংদী: একজন ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা হয়েও কীভাবে সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন—তা নিয়ে নরসিংদীতে তীব্র আলোড়ন ও তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। অভিযুক্ত ব্যক্তির নাম মোঃ আলিমউদ্দিন, যিনি বর্তমানে মনোহরদীর চন্দনবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে কর্মরত। শিবপুরের পুটিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে থাকাকালীন তাঁর বিরুদ্ধে ঘুষ, নামজারি জালিয়াতি ও সরকারি রাজস্ব ফাঁকির মাধ্যমে অঢেল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
সাড়ে ৫ কোটি টাকার সাম্রাজ্য একজন সরকারি ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তার সীমিত বেতনের চাকরি করে নরসিংদী শহরে আটতলা বিশিষ্ট ডুপ্লেক্স ভিলাসহ বহুতল ভবন নির্মাণ করার তথ্য পাওয়া গেছে। অনুসন্ধানে দেখা যায়, শিবপুরে তাঁর ৫ শতাংশ জমি এবং বাসাইল এলাকায় যথাক্রমে ৩ শতাংশ ও ৮ শতাংশের দুটি প্লট রয়েছে। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, তাঁর অর্জিত এই স্থাবর সম্পদের আনুমানিক বাজারমূল্য অন্তত সাড়ে ৫ কোটি টাকা।
ঘুষ ও অনিয়মের অভিযোগ অনুসন্ধানে জানা যায়, পুটিয়া ইউনিয়ন ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে হারিধোঁয়া নদীর ওপর অবৈধ স্থাপনা তৈরি থেকে শুরু করে বিসিক শিল্প এলাকার জমি নামজারিতে মোটা অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণ করতেন আলিমউদ্দিন। প্রতি নামজারিতে ৫ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা এবং দলিলে ভুলত্রুটি থাকলে ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া চার লেনের রাস্তা ও সরকারি উন্নয়ন কাজের অধিগ্রহণে জমির শ্রেণি পরিবর্তন (যেমন: নাল জমিকে দোকান বা বাড়ি হিসেবে দেখানো) এবং সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের প্রমাণ মিলেছে।
একই জমি দুই জনের নামে নামজারি সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটে একই দাগ-খতিয়ানের জমি দুইজনের নামে নামজারি করে দেওয়ার ঘটনায়। জানা যায়, আকাবর মোল্লা নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে নামজারি করে দেন তিনি। এর ঠিক এক বছর পর একই জমি রাসেলের কাছ থেকে ৫০ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে আবারও নামজারি করে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে আকাবর মোল্লার ছেলে মহসিন মোল্লা বিষয়টি জানতে পেরে অফিসে গিয়ে প্রতিবাদ করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ঘটনা ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা স্থানীয় প্রভাবশালী নেতাদের সহায়তায় মুচলেকা দিয়ে ক্ষমা চান এবং বিষয়টি সংশোধনের প্রতিশ্রুতি দেন।
শাস্তির বদলে ‘পুরস্কার’! পূর্বে তাঁর এসব দুর্নীতি, ঘুষ গ্রহণ ও অনিয়মের খবর একাধিক জাতীয় পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল, ইউটিউব ও টিভি চ্যানেলে প্রচারিত হয়। তবে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে তৎকালীন শিবপুর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) তাঁকে মনোহরদীর চন্দনবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করেন, যা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে অতীতে বিভিন্ন সময় আলিমউদ্দিন মন্তব্য করেছিলেন—”আমি তো এসব টাকা একা খাই না, উপর মহলকেও দিতে হয়। না দিলে ভালো স্টেশনে থাকা যায় না, দূর-দূরান্তে বদলি করে দেবে।”
দালাল সিন্ডিকেট ও সুশীল সমাজের দাবি অনুসন্ধানে জানা গেছে, আলিমউদ্দিনের অধীনে একজন সহকারীসহ ১০ জনের একটি সক্রিয় দালাল চক্র রয়েছে। এলাকাভিত্তিক সরকারি সেবা পাইয়ে দেওয়ার নামে এই চক্রটি গ্রাহকদের জিম্মি করে অর্থ আদায় করত। চন্দনবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি অফিসে আসার পরও তিনি নতুন সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে জানা গেছে।
এই দুর্নীতিবাজ ও ঘুষখোর কর্মকর্তার আয়ের উৎস এবং তাঁর নামে-বেনামে থাকা সম্পদের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছে এলাকার সুশীল সমাজ। নরসিংদীর জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) আশু হস্তক্ষেপ কামনা করে তাঁর বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানানো হয়েছে।
অনলাইন ডেস্ক 




















