
দেশের কারাগারগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বেড়ে চলেছে বন্দী মৃত্যুর ঘটনা। কারাগার থেকে হাসপাতালে নেওয়ার পথেই মারা যাচ্ছেন অনেক বন্দী, আবার অনেকের মৃত্যু হচ্ছে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। মৃতদের একটি বড় অংশই অল্প ও মধ্যবয়সী, অর্থাৎ অকালমৃত্যুর শিকার হচ্ছেন তারা।
কারা অধিদপ্তর ও ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত (প্রায় পৌনে ছয় বছরে) সারাদেশে ১,২৩৫ জন বন্দীর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে কেবল হাসপাতালেই নিয়ে যাওয়ার পথে অন্তত ৩০০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে গতকাল মঙ্গলবার রাতে। কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগার-২ থেকে অসুস্থ অবস্থায় আবু তাহের (৩৪) নামের এক বন্দীকে রাত সোয়া ৯টার দিকে ঢাকার জাতীয় বক্ষব্যাধি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে আনা হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের জ্যেষ্ঠ কারা তত্ত্বাবধায়ক গোলাম ফারুক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
চলতি বছর মৃত্যুহার সবচেয়ে বেশি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৯ মাসে অন্তত ২৫১ জন বন্দী মারা গেছেন। অর্থাৎ, চলতি বছর প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ২৮ জন বন্দী প্রাণ হারিয়েছেন। যেখানে গত পৌনে ছয় বছরের গড় মাসিক মৃত্যুসংখ্যা ছিল প্রায় ১৮। ফলে দেখা যাচ্ছে, সাম্প্রতিক সময়ে বন্দী মৃত্যুর ঘটনা অনেকটাই বেড়েছে।
অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও চিকিৎসাসেবার চরম সংকট মৃত বন্দীদের স্বজনদের অভিযোগ, ধারণক্ষমতার চেয়ে বহুগুণ বেশি বন্দী রাখায় কারাগারের ভেতরে চরম গাদাগাদি ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি হচ্ছে। এতে আগে থেকে অসুস্থ বা নতুন করে অসুস্থ হওয়া বন্দীরা সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা পাচ্ছেন না।
এ বিষয়ে কারা কর্তৃপক্ষও চিকিৎসাসেবার সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছে। ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক (আইজি প্রিজন) কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল জানান:
-
জনবল ও যানবাহনের ঘাটতি: কারা হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও অ্যাম্বুলেন্স নেই। অস্থায়ী ভিত্তিতে নিযুক্ত চিকিৎসকেরা দিনে মাত্র দু-এক ঘণ্টা থাকেন। জরুরি মুহূর্তে বাইরে থেকে গাড়ি ভাড়া করে রোগী পাঠাতে গিয়েই অনেকটা সময় নষ্ট হয়।
-
যানজট ও স্থানান্তরের বিলম্ব: কেরানীগঞ্জের ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে কোনো মুমূর্ষু রোগীকে ঢাকা মেডিকেলে নিতে যানজটের কারণে ৩ ঘণ্টারও বেশি সময় লেগে যায়। এছাড়া ঢাকার বাইরের কারাগারগুলো থেকে স্থানান্তরিত রোগীদের রাজধানীর বিশেষায়িত হাসপাতালগুলোতে পাঠাতে দীর্ঘ সময়ক্ষেপণ হয়, যা পথেই অনেকের মৃত্যুর প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
-
ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত বন্দী: সারাদেশে ৪৫,১৮৬ জন বন্দী ধারণক্ষমতার বিপরীতে বর্তমানে রাখা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার বন্দী।
উদ্বিগ্ন কারা অধিদপ্তর, চিঠি প্রদান হাসপাতালে নেওয়ার পথেই বন্দীদের একের পর এক মৃত্যুর ঘটনায় উদ্বিগ্ন কারা অধিদপ্তরও। এ পরিস্থিতি ঠেকাতে গত ২৫ জানুয়ারি সব জেল সুপারকে চিঠি পাঠিয়ে ‘ব্রট ইন ডেড’-এর সংখ্যা কমাতে জরুরি ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছিল। তবে বাস্তব চিত্র বলছে, পর্যাপ্ত প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা না বাড়ায় সংকট এখনো তৈরি হয়ে আছে।
অনলাইন ডেস্ক 

























