
দেশের প্রাণিসম্পদ ও দুগ্ধ খাতের বৈপ্লবিক পরিবর্তন এবং খামারিদের ভাগ্য বদলের আশা নিয়ে ২০১৯ সালে যাত্রা শুরু করেছিল ৪ হাজার ২৮০ কোটি টাকার ‘প্রাণিসম্পদ ও ডেইরী উন্নয়ন প্রকল্প’ (এলডিডিপি)। বিশ্বব্যাংক ও বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে গঠিত পাঁচ বছর মেয়াদী এই মেগা উদ্যোগের মেয়াদ শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছে। তবে যে লক্ষ্য নিয়ে প্রকল্পটির সূচনা হয়েছিল, কতিপয় অসাধু কর্মকর্তা ও প্রশাসনিক অনিয়মের কারণে তা এখন ভেস্তে যেতে বসেছে। ৫ বছরে লক্ষ্যমাত্রার ৩৫ শতাংশও অর্জিত হয়নি, উল্টো যুক্ত হয়েছে শত শত কোটি টাকার লুটপাট ও চরম অনিয়মের চাঞ্চল্যকর সব অভিযোগ।
ইতোমধ্যে এই প্রকল্পের ব্যাপক দুর্নীতি, ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ জমা পড়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে। নথিপত্র ও অভিযোগের তথ্যমতে, এই বিশাল আর্থিক হরিলুটের পেছনে মূল কারিগর হিসেবে আঙুল উঠেছে প্রকল্পের পারম্ভিক পিডি মো: আব্দুর রহিম, সিটিসি ডাঃ গোলাম রাব্বানী, ডিপিডি ড. মো: সাকিফ উল আযম, সাবেক ডিপিডি মুস্তানুর এবং সাবেক ডিজি ডাঃ মো: এমদাদুল হক তালুকদারের দিকে। নানা কৌশলে প্রকল্পের বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েও তারা এখনো অধরা রয়েছেন।
আধুনিক খামার গড়ে তোলা ও উদীয়মান উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে রাখা হয়েছিল ৩০০ কোটি টাকার ‘ম্যাচিং গ্র্যান্ট’ বা অনুদান কর্মসূচি। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, প্রান্তিক ও প্রকৃত খামারিদের বঞ্চিত করে এই অর্থের একটি বড় অংশই তুলে দেওয়া হয়েছে প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং স্বার্থসংশ্লিষ্ট মহলের হাতে। ব্যাকডেটে আবেদন তৈরি, ভুয়া বিল-ভাউচার প্রদান এবং নীতিমালার শর্ত পূরণ না করেই অনুদান ছাড়ের ভূরি ভূরি প্রমাণ মিলছে।
সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য উঠে এসেছে রংপুর অঞ্চলকে ঘিরে। সারাদেশের খামারিদের জন্য বরাদ্দকৃত এই ম্যাচিং গ্র্যান্টের প্রায় ৯০ শতাংশই কেন্দ্রীয় নীতিমালার বাইরে গিয়ে শুধুমাত্র রংপুর অঞ্চলে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে। নির্দিষ্ট একটি অঞ্চলে কীভাবে এত বড় অঙ্কের অনুদান গেল এবং কারা এর প্রকৃত সুবিধাভোগী—তা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
গাজীপুরের কালীগঞ্জে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি যেন অনিয়মের চূড়ান্ত উদাহরণ। সরকারি অর্থ আত্মসাতের উদ্দেশ্যে তৎকালীন উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তার স্ত্রীর নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান ‘শনপাপড়ি মিঠাই ঘর’-এর অনুকূলে খামারিদের বরাদ্দ থেকে ১২ লাখ ৪৫ হাজার টাকা অনুদান হিসেবে দেওয়া হয়েছে। দুগ্ধ খাত ও খামারিদের জন্য নির্ধারিত তহবিল কীভাবে এক কর্মকর্তার স্ত্রীর মিষ্টির দোকানের নামে অনুমোদিত হলো, তা নিয়ে এখন তীব্র সমালোচনা চলছে।
শুধু রংপুর বা কালীগঞ্জ নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তেই ছড়িয়ে পড়েছে এই প্রকল্পের জালিয়াতি:
-
ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম): প্রান্তিক খামারিদের নিবন্ধন, প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বরাদ্দ করা অর্থ প্রশিক্ষণ না করিয়েই আত্মসাৎ করার অভিযোগ উঠেছে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
-
ত্রিশাল (ময়মনসিংহ) ও মুজিবনগর (মেহেরপুর): খামারি গ্রুপ গঠন, ছাগল ও মুরগির শেড নির্মাণের নামে বাস্তব কাজের সাথে সামঞ্জস্যহীন অতিরিক্ত ব্যয় দেখানো হয়েছে। অনেক স্থানে কোনো কাজ না করেই ভুয়া ভাউচারে বিল তুলে নেওয়া হয়েছে।
সরকারি নিরীক্ষা ও পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এলডিডিপির ভয়াবহ আর্থিক অব্যবস্থাপনা ফুটে উঠেছে:
-
১৩৫ কোটি টাকার অডিট আপত্তি: একটি মাত্র সরকারি নিরীক্ষাতেই প্রকল্পের ২৬টি বিষয়ে মোট ১৩৫ কোটি টাকার গুরুতর আর্থিক আপত্তি তোলা হয়েছে।
-
২৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকার ক্রয় জালিয়াতি: সরকারি ক্রয় বিধিমালা (PPR) তোয়াক্কা না করে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ দিতে গিয়ে চারটি কেনাকাটা প্যাকেজে প্রায় ২৫৪ কোটি ৬৭ লাখ টাকার নিয়ম লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অতিরিক্ত মূল্যে বিলাসবহুল গাড়ি কেনা এবং অকার্যকর যন্ত্রপাতি কেনাকাটায় এই অর্থ অপচয় হয়।
-
ধুলো জমছে কোটি টাকার যন্ত্রপাতিতে: সঠিক প্রশিক্ষণ না দিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি মাঠে পাঠানোয় তা খামারিদের কোনো কাজে আসছে না, পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে।
আলোচনায় প্রকল্পের ৫ শত থেকে ৭ শত কোটি টাকার ক্ষতির দাবি করা হলেও, অডিট আপত্তি, আর্থিক ক্ষতি এবং প্রমাণিত আত্মসাতের হিসাব স্পষ্ট করতে সিএজি (CAG) রিপোর্ট, দুদক তদন্ত এবং ব্যাংক লেনদেনের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ প্রয়োজন। বিশ্বব্যাংকের বিবরণীতে আর্থিক রেকর্ড ‘Unqualified’ হিসেবে দেখানো হলেও দেশীয় অডিটে যে সমস্ত জালিয়াতি ও প্রশাসনিক অনিয়ম উঠে এসেছে, তা ভিন্ন মাত্রা নির্দেশ করে।
খামারিদের উন্নয়নের নামে হাজার কোটি টাকার এই মহাপরিকল্পনা আজ দুর্নীতির কারণে প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও দুদক যদি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত না করে, তবে প্রাণিসম্পদ খাতের উন্নয়ন পুরোপুরি মুখ থুবড়ে পড়বে।
অনলাইন ডেস্ক 





















