
সমবায় অধিদপ্তরের (অডিট ও আইন) অতিরিক্ত নিবন্ধক মো. নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরিতে যোগদান, কোটি কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং শারীরিক নির্যাতনের মতো গুরুতর নানা অভিযোগ উঠেছে। দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা এসব অপকর্মের তথ্য-প্রমাণ সামনে এলেও অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে তিনি বারবার পার পেয়ে গেছেন বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
জাল সনদ ও ঘুষের বিনিময়ে বিসিএসে নিয়োগ
মাগুরা জেলার লক্ষীকোল গ্রামের বাসিন্দা মৃত মো. সহিদুল ইসলামের ছেলে নবীরুল ইসলাম ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে সমবায় ক্যাডারে সহকারী নিবন্ধক হিসেবে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, বাবার ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে এবং তদানীন্তন বিপিএসসি সদস্যের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ লেনদেন করে তিনি লিখিত ও সনদ যাচাই পর্বে উত্তীর্ণ হন।
এই জালিয়াতির ঘটনায় ২০০১ সালে ঢাকার কাফরুল থানায় একটি মামলা (নং-২৪) দায়ের হয়। মামলাটি তৎকালীন দুর্নীতি দমন ব্যুরো তদন্ত শুরু করলেও ঘুষ ও রাজনৈতিক প্রভাবে তা ধামাচাপা পড়ে। পরবর্তীতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের গোপন চিঠি এবং বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে তিনি মামলা থেকে অব্যাহতি পান।
পরিদর্শন ফি ও সমিতির নিবন্ধনে চাঁদাবাজি
ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা থাকাকালে নবীরুল ইসলাম ঘুষের একটি বলয় গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ। সমবায় সমিতি পরিদর্শনের নামে ফি আদায়, বেআইনিভাবে ‘মাইক্রোক্রেডিট’ বা ক্ষুদ্রঋণের সুযোগ দান এবং নতুন শাখা খোলার অনুমতির নামে প্রতি শাখা থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
নথি অনুযায়ী, ঢাকা জেলা সমবায় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনের মাত্র ৭-৮ মাসেই তিনি প্রায় ১ কোটি টাকা অবৈধভাবে উপার্জন করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নিষিদ্ধ ঘোষিত ‘যুবক’ নামের প্রতিষ্ঠানের প্রায় ১৫০টি ভুয়া সমিতির নিবন্ধন দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগও তাঁর বিরুদ্ধে রয়েছে।
ফ্ল্যাট, প্লট ও ঘুষ গ্রহণের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ
মিরপুর প্রকল্প: মিরপুরের বহুমুখী ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের বেআইনি কমিটি গঠনের জন্য ১০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ।
দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ: প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনিয়ম ধামাচাপা দিতে এবং উচ্চ আদালতের নির্দেশ অমান্য করে ব্যাংক হিসাব থেকে টাকা তোলার সুযোগ দিতে ২০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ (যা তৎকালীন যুগ্ম নিবন্ধক নজীর আহমেদের তদন্তেও প্রমাণিত)।
পি.সি. কালচার হাউজিং: মোহাম্মদপুরের এই সোসাইটিতে পদ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে সাবেক চেয়ারম্যানের কাছ থেকে স্ত্রীর নামে ৩ কাঠার একটি মূল্যবান প্লট নেওয়ার অভিযোগ।
জমি বিক্রির অর্থ আত্মসাৎ: ২০১১ সালে সিরাজগঞ্জে দায়িত্ব পালনকালে কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের ৬ শতক জমি অবৈধভাবে বিক্রির সঙ্গে যুক্ত থাকা।
শারীরিক নির্যাতন ও প্রশাসনিক ক্যাডারকে লাঞ্ছিত করা
অর্থনৈতিক দুর্নীতির পাশাপাশি শারীরিক নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ রয়েছে এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
২০০৭ সালে সমবায় ভবনের সামনে ‘দি ঢাকা মার্কেন্টাইল কো-অপারেটিভ’-এর এক পরিচালককে নিজ হাতে পিটিয়ে রক্তাক্ত করেন। গঠিত তদন্ত কমিটি তাঁকে ‘পক্ষপাতদুষ্ট, হিংস্র ও অমানবিক’ হিসেবে চিহ্নিত করে স্থায়ীভাবে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছিল।
২০১৩ সালে রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে বাধা দেওয়ায় তৎকালীন বিভাগীয় যুগ্ম নিবন্ধককে লাঞ্ছিত করার অভিযোগ ওঠে।
আগারগাঁওয়ে হামলায় ১ নম্বর আসামি
সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১৯ আগস্ট আগারগাঁওয়ের সমবায় অধিদপ্তরের কার্যালয়ে ‘কর্ণফুলী গার্ডেন সিটির’ নির্বাচন সংক্রান্ত নথিপত্র জমা দিতে গেলে সাইফুল ইসলাম সজীব নামের এক ব্যক্তির ওপর হামলা চালানো হয়। এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় দায়ের করা মামলায় (দণ্ডবিধি ১৪৩/৪৪৮/৩৪১/৩৪২/৩৫৭/৩২৩/৩৭৯/৫০৬/১১৪/৩৪) নবীরুল ইসলামকে ১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া ও বর্তমান অবস্থান
অভিযোগ রয়েছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক এক প্রভাবশালী মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে বদলি, পদোন্নতি ও লাইসেন্স সিন্ডিকেট পরিচালনা করেছেন তিনি। ক্ষমতার পালাবদলের পরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে তিনি অতিরিক্ত নিবন্ধক পদে বহাল রয়েছেন।
এসব গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে জানতে তাঁর মুঠোফোনে ও লিখিতভাবে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
দপ্তরের কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীদের দাবি, সমবায় অধিদপ্তরকে দুর্নীতিমুক্ত করতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে তাঁর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন।
অনলাইন ডেস্ক 





















