
বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক (বিনিয়োগ) শাহরিয়ার আল হাসানের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে চাকরি লাভ, প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, বিপুল অর্থ আত্মসাৎ, বিনিয়োগকারীদের হয়রানি, জমি বরাদ্দের বিনিময়ে অর্থ গ্রহণ এবং সরকারি সেবা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করার মতো গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক এবং নারায়ণগঞ্জের সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল।
রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে চাকরি লাভের অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, শাহরিয়ার আল হাসান আওয়ামী লীগ নেতা আশরাফুল আলম খোকনের সঙ্গে রাজনীতি করতেন এবং তাঁর ঘনিষ্ঠতার সূত্র ধরে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষে চাকরি লাভ করেন। আশরাফুল আলম খোকন গাজীপুরের কাপাসিয়ার সন্তান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপ-প্রেস সচিব ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য হন।
অভিযোগকারীদের দাবি, আশরাফুল আলম খোকনের প্রভাব কাজে লাগিয়ে শাহরিয়ার আল হাসান হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষে চাকরি পান এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। গাজীপুরের সাবেক সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমির ছোট ভাইয়ের পরিচয়ের সূত্রেও তিনি তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, পলকের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণেই চাকরির শুরু থেকেই তাঁকে ১১টি আইটি প্রকল্পের একজন উপপ্রকল্প পরিচালক (ডিপিডি) হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। অভিযোগকারীরা শাহরিয়ার আল হাসানকে পলক-ঘনিষ্ঠ একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীর অন্যতম সদস্য হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
১১টি আইটি প্রকল্পে ডিপিএম পদ্ধতি নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ
অভিযোগে পলক, নরোত্তম, মিলন, কল্যাণ ও শাহরিয়ার আল হাসানের নাম উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তাঁদের সংশ্লিষ্টতায় ১১টি আইটি প্রকল্পের ক্রয়প্রক্রিয়ায় ডিপিএম (ডাইরেক্ট প্রকিউরমেন্ট মেথড) পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি, শুরুতে প্রকল্পটির উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) অনুযায়ী ডিপিএম পদ্ধতির বিধান ছিল না। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠী প্রতিযোগিতামূলক ক্রয়পদ্ধতি এড়িয়ে অবৈধভাবে ডিপিএম পদ্ধতি চালু করে। এর মাধ্যমে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ উদ্দেশ্যে পরবর্তী সময়ে প্রকল্পের ব্যয় বহুগুণ বাড়ানো হয় এবং রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় ও তছরুপ ঘটে বলেও অভিযোগকারীদের দাবি।
একই অভিযোগে বলা হয়েছে, এই প্রকল্প থেকে শাহরিয়ার আল হাসান প্রায় ১০ কোটি টাকা ভাগ পেয়েছিলেন। তবে ওই অর্থের লেনদেন, প্রকল্পের ব্যয় বৃদ্ধি কিংবা অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের পক্ষে কোনো আর্থিক নথি বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই লেখায় উপস্থাপন করা হয়নি।
অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, অর্থের ভাগ নিয়ে অসন্তোষের কারণে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এর জেরে প্রকল্প পরিচালক এবং আরেক উপপ্রকল্প পরিচালক কল্যাণ কুমার সরকারকে প্রকল্প থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
আদাবরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও বসিলায় জমি কেনার অভিযোগ
শাহরিয়ার আল হাসান আদাবরে একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট গড়ে তুলেছেন এবং মোহাম্মদপুরের বসিলা এলাকায় দুটি জায়গা কিনেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, রাজধানীর কাওরান বাজারে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের সামনে দীর্ঘদিন ধরে তাঁর সহকারী জসিমকে দিয়ে কাঁচাবাজারের ভাড়া আদায় করানো হতো এবং সেই অর্থ তিনি একাই ভোগ করতেন।
বিনিয়োগকারীদের হয়রানি ও ঘুষ দাবির অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, বিনিয়োগ শাখায় দায়িত্ব পালনকালে শাহরিয়ার আল হাসান বিনিয়োগকারীদের নিয়মিত হয়রানি করতেন এবং সেবা দেওয়ার বিনিময়ে ঘুষ দাবি করতেন। জমি বরাদ্দ, চুক্তি যাচাই এবং জমি বুঝিয়ে দেওয়ার বিভিন্ন পর্যায়ে বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগে বলা হয়েছে, জমি বরাদ্দ দেওয়ার ক্ষেত্রে পাল্মপে ফিনটেক, ঢাকাকোলা, এডভ্যান্স উইথবোর্ড, মেটা স্টার, পালকি মটরস এবং জিটেক সলিউশন লিমিটেডসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ গ্রহণ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া চুক্তি ভেরিফিকেশন, জমি বুঝিয়ে দেওয়া, জমি বরাদ্দ এবং চুক্তি সম্পাদনের বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ নেওয়া হতো বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
নারায়ণগঞ্জে জমি অধিগ্রহণ ও শামীম ওসমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, বিনিয়োগ শাখায় দায়িত্ব পালনের সময় শাহরিয়ার আল হাসান জমি অধিগ্রহণের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্যদের সঙ্গে যোগসাজশ করে অনুপযুক্ত স্থান নির্বাচন করতেন এবং এর বিনিময়ে কমিশন গ্রহণ করতেন। বিশেষ করে নারায়ণগঞ্জে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের সঙ্গে যোগসাজশে সবচেয়ে ব্যয়বহুল জমি কেনা হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, শামীম ওসমানের সঙ্গে শাহরিয়ার আল হাসানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং হাই-টেক পার্কের জমি অধিগ্রহণের নামে ও বেনামে তিনি বিপুল অর্থসম্পদের মালিক হন। জমি নির্বাচনের ক্ষেত্রে অনিয়মের কারণে আইটি সেন্টারগুলো প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি বলেও অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে পার্কগুলোর জন্য ভুল স্থানে জমি নির্বাচন এবং সংশ্লিষ্ট প্রকল্পগুলোর ব্যর্থতার দায় শাহরিয়ার আল হাসান এড়াতে পারেন না বলে অভিযোগকারীরা মনে করেন।
তবে জমি অধিগ্রহণের মূল্য, স্থান নির্বাচনের কারিগরি যৌক্তিকতা, কমিশন গ্রহণের প্রমাণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে আর্থিক লেনদেনের তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
রাজনৈতিক প্রতীক প্রদর্শন ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক
অভিযোগে বলা হয়েছে, শাহরিয়ার আল হাসান নিজের কার্যালয়ে নিয়মিত শেখ মুজিবুর রহমান, শেখ হাসিনা ও সজীব ওয়াজেদ জয়ের ছবি টাঙিয়ে রাখতেন, যদিও সেগুলো রাখার কোনো বাধ্যবাধকতা ছিল না বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
একজন সহকারী পরিচালকের বিয়েতে তৎকালীন প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের উপস্থিতির বিষয়টিও তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের প্রমাণ হিসেবে অভিযোগে তুলে ধরা হয়েছে। আশরাফুল আলম খোকনের পরিচয়ের সূত্র ধরেই পলকের সঙ্গে তাঁর গভীর সখ্যতা গড়ে ওঠে এবং আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি উপপ্রকল্প পরিচালক হওয়ার সুযোগ পান বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ক্ষমতায় যে রাজনৈতিক দল থাকে, সেই দলের নেতাদের মাধ্যমে যোগাযোগ স্থাপন করে নিজেকে ওই দলের ঘনিষ্ঠ হিসেবে উপস্থাপন করা শাহরিয়ার আল হাসানের একটি কৌশল। অভিযোগকারীদের দাবি, তিনি বর্তমানে বিএনপি সরকারের বিভিন্ন কার্যক্রমে সহযোগিতা করছেন না; বরং সরকারকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করছেন এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতার কাছে তথ্য সরবরাহ করছেন।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় ফেসবুক পোস্ট ও মামলায় আসামি
অভিযোগে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় শাহরিয়ার আল হাসান ফ্যাসিবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বিরুদ্ধে ফেসবুকে পোস্ট করেছিলেন। পরে তিনি সেই পোস্ট মুছে ফেলেন।
এ ছাড়া তাঁর বিরুদ্ধে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে । ওই মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে এক নম্বর আসামি এবং শাহরিয়ার আল হাসানকে ১৬ নম্বর আসামি করা হয়েছে। সাবেক প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকও একই মামলার আসামি।
মামলাটি বর্তমানে তেজগাঁও থানায় তদন্তাধীন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, গাজীপুরের কাপাসিয়া আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে শাহরিয়ার আল হাসান সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব খাটাতেন। চাকরিজীবনের পুরো সময় আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক সুবিধা নিয়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন এবং এখনো আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছেন বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
প্রকল্পে সহযোগীদের ফিরিয়ে আনা ও ডিজিটাল ডিভাইস এক্সপো-২০২৬ নিয়ে অভিযোগ
অভিযোগকারীদের দাবি, শাহরিয়ার আল হাসান বর্তমানে প্রকল্পে তাঁর দুর্নীতির অন্যতম সহযোগী হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তিকে পুনরায় ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছেন। অফিসের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) ঘনিষ্ঠ হওয়ার সুযোগে তিনি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করলেও জনসেবামূলক কার্যক্রমে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন না বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁর কর্মকাণ্ডের কারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম ব্যর্থতার মুখে পড়ছে বলেও অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
সর্বশেষ ডিজিটাল ডিভাইস এক্সপো-২০২৬ আয়োজন থেকে শাহরিয়ার আল হাসান ও তাঁর কয়েকজন সহযোগী প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতির সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা এ বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগও দিয়েছিলেন বলে মূল লেখায় উল্লেখ করা হয়েছে। তবে তৎকালীন সাবেক সচিব সেই অভিযোগ আমলে নেননি বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগকারীদের মতে, শাহরিয়ার আল হাসানের কর্মকাণ্ডের কারণে সর্বশেষ এক্সপোটি সফল হয়নি।
বিনিয়োগকারীদের চুক্তি আটকে রাখা ও রাজস্ব হারানোর অভিযোগ
অভিযোগে বলা হয়েছে, শাহরিয়ার আল হাসান বর্তমানে রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও যশোর হাই-টেক পার্কের বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে অর্থ না পাওয়ায় তাঁদের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করছেন না। এর ফলে বিনিয়োগ কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে এবং সরকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, জমি বরাদ্দ থেকে শুরু করে চুক্তি সম্পাদন, চুক্তি যাচাই এবং জমি বুঝিয়ে দেওয়ার প্রতিটি পর্যায়ে অর্থ দাবি করার কারণে তাঁরা অতিমাত্রায় বিরক্ত। এত অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক তাঁকে নিজের ঘনিষ্ঠ হিসেবে কাছে রেখেছেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 















