
ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এর চলতি দায়িত্বে থাকা নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহর বিতর্কিত পদায়ন এবং তার বিরুদ্ধে ওঠা নানা দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বিগত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর আত্মীয় পরিচয়ে চাকরিতে প্রবেশ করা এই কর্মকর্তা বর্তমানে রাষ্ট্রের অন্যতম সংবেদনশীল স্থাপনা—প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের সার্বিক দায়িত্বে রয়েছেন। এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে তার পদায়ন নিয়ে খোদ সংশ্লিষ্ট মহলেই নিরাপত্তা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ৩৩তম বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা প্রচলিত নিয়ম ও লটারির মানদণ্ড উপেক্ষা করে নিজের পছন্দমতো পদায়ন বাগিয়ে নিয়েছেন। গণপূর্ত অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সংস্থাপন) সরোয়ার জাহান বিপ্লবকে ৩ কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে এই বদলি নিশ্চিত করা হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। এমনকি আর্থিক লেনদেনের একটি স্পর্শকাতর ভিডিওচিত্রও গণমাধ্যমের হাতে এসেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৬ সালে ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পাওয়ার পর সাবেক মন্ত্রী আমির হোসেন আমুর প্রভাবে প্রথম পোস্টিং হিসেবে নগর গণপূর্ত বিভাগে স্টাফ অফিসার হিসেবে যোগ দেন মাসুম বিল্লাহ। সেখান থেকেই শুরু হয় তার দ্রুত অর্থবিত্ত গড়ার প্রতিযোগিতা।
নগর গণপূর্তে দায়িত্ব পালনকালে টেন্ডার ও ঠিকাদারি নিয়ন্ত্রণে সক্রিয় ছিলেন তিনি। গোপালগঞ্জের ছাত্রলীগ ক্যাডার দীন ইসলামের মালিকানাধীন ‘এস এ এন্টারপ্রাইজ’সহ ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক বলয়ের ঠিকাদারদের অনৈতিক উপায়ে কাজ পাইয়ে দিয়ে ১ থেকে ২ শতাংশ কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। কেবল তিনটি অর্থবছর থেকেই এই খাত থেকে প্রায় ২ কোটি টাকা হাতিয়ে নেন তিনি।
পরবর্তীতে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী (এসডিই) হিসেবে মিরপুর উপবিভাগ-২-এ দায়িত্ব নেওয়ার পর পাইকপাড়া অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে ভুয়া বিল-ভাউচার ও অগ্রিম অর্থ ছাড়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এরপর শের-ই-বাংলা নগর ৩ নম্বর উপবিভাগে পদায়ন পেয়ে তার ঘুষ ও ঠিকাদারি বাণিজ্যের পরিধি আরও বিস্তৃত হয়।
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলার কাঠিরপাড়া গ্রামে একসময় সাধারণ টিনের ঘরে বসবাসকারী মাসুম বিল্লাহ চাকরিতে যোগ দেওয়ার পরই অলৌকিক উপায়ে বিপুল সম্পদের মালিক বনে যান। নিজের গ্রামে গড়ে তোলেন চোখ ধাঁধানো সম্পদ। ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও কোটি টাকার বিনিময়ে তিনি এখনো বহাল তবিয়তে একই চেয়ারে টিকে আছেন বলে অভিযোগ বঞ্চিত প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের। অনতিবিলম্বে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়া হলে যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির দায় বর্তমান প্রশাসনকে নিতে হবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন বৈষম্যবিরোধী প্রকৌশলীরা।
ইতিমধ্যে মাসুম বিল্লাহর ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ ও অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়গুলো অনুসন্ধানের জন্য দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে। যার প্রেক্ষিতে দুদক তার পাশাপাশি তার বড় ভাই শফিউল বসর ও স্ত্রী নাইমা আক্তার সুমার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনুসন্ধান শুরু করেছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বিগত সরকারের আমলে এই পরিবারটি নির্বাচনী কার্যক্রমে বিপুল অর্থায়ন করত এবং তাদের বাড়িতে সবসময় নগদ টাকা ও সোনা মজুত রাখা হতো। গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পালাবদলের পর বহু আওয়ামী লীগ নেতা তাদের বাড়িতে কোটি কোটি টাকা গচ্ছিত রেখে যান। এর ধারাবাহিকতায় গত ৫ অক্টোবর রাতে তাদের গ্রামের বাড়িতে হওয়া এক ডাকাতির ঘটনায় ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা এবং শত শত ভরি সোনা লুট হয় বলে জানান স্থানীয়রা। তবে অর্থের বৈধ উৎস দেখাতে না পারায় থানায় মাত্র ১৩ ভরি সোনা, ৭ লাখ ৫৭ হাজার টাকা ও ৪টি মোবাইল ফোন চুরির কথা উল্লেখ করে প্রকৃত তথ্য গোপন করা হয়।
এসব অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি দাবি করেন, সংবেদনশীল এই স্থানে তার পদায়ন ও দায়িত্ব পাওয়ার বিষয়টি সম্পর্কে জাতীয় নিরাপত্তা গোয়েন্দা সংস্থা (এনএসআই) এবং প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) অবগত রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















