
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে হত্যা মামলার আসামি হওয়া এবং শতকোটি টাকা তছরুপের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ মাথায় নিয়েও বহাল তবিয়তে আছেন বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক (বিনিয়োগ) শাহরিয়ার আল হাসান। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় গড়ে ওঠা সিন্ডিকেটের এই সদস্য বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. ফজলুর রহমানের আশীর্বাদে এখনো নিজের গুরুত্বপূর্ণ পদ আঁকড়ে আছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
রাজনৈতিক প্রভাবে নিয়োগ ও ক্ষমতার অপব্যবহার
অনুসন্ধানে জানা যায়, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকনের সঙ্গে সুসম্পর্কের সূত্র ধরে সাবেক আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের হাত ধরে হাই-টেক পার্কে চাকরি পান শাহরিয়ার। গাজীপুরের সাবেক এক প্রতিমন্ত্রীর পরিচয় ব্যবহার করে পলকের ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠেন তিনি। বিগত সরকারের পুরো সময়জুড়ে নিজ কার্যালয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও দলীয় প্রধানদের ছবি টানিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে আসছিলেন এই কর্মকর্তা।
১১ আইটি প্রকল্পে ১৫০-২০০ কোটি টাকা লুটপাট
পলক চক্রের অন্যতম হোতা হিসেবে শাহরিয়ার আল হাসান ১১টি আইটি প্রকল্পে নিয়মবহির্ভূতভাবে ডিপিএম (DPM) করে প্রায় ১৫০ থেকে ২০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে একাই প্রায় ১০ কোটি টাকা ভাগ নেন তিনি। এই হরিলুটের ঘটনায় প্রকল্পের অন্য সদস্যদের সঙ্গে বিরোধ দেখা দিলে প্রকল্প পরিচালক ও অপর ডিপিডি কল্যাণ কুমার সরকারকে সরিয়ে দেওয়া হয়। মূলত ভুল স্থান নির্বাচন ও ব্যাপক অনিয়মের কারণে সরকারের আইসিটি সেন্টারগুলো আজ কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে।
নামে-বেনামে সম্পদ ও চাঁদাবাজি
দুর্নীতির টাকায় রাজধানীর আদাবরে বিলাসবহুল ফ্ল্যাট এবং মোহাম্মদপুরের বসিলায় দুটি প্লট কিনেছেন শাহরিয়ার। কারওয়ান বাজারে সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্কের সামনে নিজের সহকারী দিয়ে কাঁচাবাজারের দোকান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করাতেন তিনি। এ ছাড়া বিনিয়োগ শাখা ও বিভিন্ন প্রকল্পে জমি বরাদ্দ, চুক্তি ভেরিফিকেশন এবং জমি বুঝিয়ে দেওয়ার নামে পামপে ফিনটেক, ঢাকাকোলা, মেটা স্টারসহ বিভিন্ন কোম্পানির কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও যশোর হাই-টেক পার্কের বিনিয়োগকারীদের ঘুষের দাবি না মেটায় তিনি চুক্তি স্বাক্ষর আটকে রেখেছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
জুলাই অভ্যুত্থানবিরোধী ভূমিকা ও মামলা
২০২৪ সালের ২০ জুলাই ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আন্দোলনের বিপক্ষে উসকানিমূলক পোস্ট দেন শাহরিয়ার আল হাসান, যা পরবর্তীতে সমালোচনার মুখে মুছে ফেলেন তিনি। এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ও হত্যার অভিযোগে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে প্রধান এবং শাহরিয়ারকে ১৬ নম্বর আসামি করা হয়েছে। বর্তমানে মামলাটি তেজগাঁও থানায় তদন্তাধীন রয়েছে।
বর্তমান প্রশাসনের ভূমিকা ও আত্মসাৎ
রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও থেমে নেই তার দুর্নীতি। হাই-টেক পার্কের এমডি মো. ফজলুর রহমানের একান্ত আস্থাভাজন হয়ে তিনি নানা অনিয়ম চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি ‘ডিজিটাল ডিভাইস এক্সপো-২৬’ থেকেও প্রায় ২০ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বাংলাদেশ কম্পিউটার সমিতি (বিসিএস) এ বিষয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা আমলে নেয়নি।
সার্বিক বিষয়ে বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের এমডি মো. ফজলুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেন। অন্যদিকে, অভিযুক্ত উপপরিচালক শাহরিয়ার আল হাসানের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য না করে লাইন কেটে দেন।
ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর, জুলাই অভ্যুত্থান মামলার আসামি এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে কঠোর তদন্ত সাপেক্ষে অপসারণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল ও দেশবাসী।
এই প্রতিবেদনটি আপনার প্রয়োজন অনুযায়ী প্রকাশ বা পরিমার্জন করতে পারেন। আর কোনো তথ্যের প্রয়োজন হলে জানাতে পারেন!
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















