
কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থার অবসান ঘটিয়ে জনগণের রায়ে দেশে ফিরেছে গণতান্ত্রিক ধারা। এই রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক জাপান সফর কেবল দ্বিপক্ষীয় চুক্তি বা আর্থিক সহায়তার গণ্ডিতে আটকে নেই; বরং এটি বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন এক আত্মপরিচয় ও অর্থনৈতিক সক্ষমতা অর্জনের বড় বার্তা দিচ্ছে।
একটি নির্বাচিত সরকারের মূল লক্ষ্যই হলো জনগণের ভোটাধিকারের প্রকৃত সুফল তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া—জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি নিশ্চিত করা। আর এই লক্ষ্য বাস্তবায়নেই ঐতিহ্যবাহী বন্ধু রাষ্ট্র জাপানের সঙ্গে সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে।
স্বাধীনতার পর থেকেই যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশের বিশ্বস্ত উন্নয়ন অংশীদার জাপান। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল কিংবা মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর—প্রতিটি মেগা প্রকল্পই দুই দেশের দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্বের নীরব সাক্ষী।
গত ২৭ অক্টোবর দুই দেশের শীর্ষ বৈঠকে গৃহীত ‘অভিন্ন সমৃদ্ধির জন্য বিগ-বি’ (BIG-B) উদ্যোগ বাংলাদেশকে বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক শিল্প, জ্বালানি ও বাণিজ্যের মূল হাব বা সংযোগকেন্দ্রে পরিণত করার পথ উন্মুক্ত করেছে। এই রূপরেখা বাস্তবায়িত হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় হবে।
আগামী পাঁচ বছরে জাপানি বেসরকারি বিনিয়োগ ১ ট্রিলিয়ন ইয়েন (প্রায় ৬৩০ কোটি মার্কিন ডলার) ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যা দেশের বাজারে প্রায় দুই লাখ নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে। তবে এই বিশাল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে শুল্ক ও লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করা, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করার কাজ অব্যাহত রাখতে হবে।
বাংলাদেশের সুলভ শ্রমশক্তি, উদীয়মান বাজার এবং জাপানের উন্নত প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনার অভিজ্ঞতা একে অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ করবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টোকিওর সঙ্গে এই কৌশলগত ঘনিষ্ঠতা বেইজিংয়ের সঙ্গে বাংলাদেশের চলমান সম্পর্কে কোনো প্রভাব ফেলবে না। জুনে বেইজিংয়ের সঙ্গে স্বাক্ষরিত যৌথ চুক্তির আওতায় মোংলা বন্দর আধুনিকায়ন ও চট্টগ্রামে শিল্পাঞ্চল গড়ার কাজ এগিয়ে চলেছে।
বিশ্লেষকদের অভিমত, চীনের যন্ত্রপাতি, জাপানের শিল্পদক্ষতা এবং বাংলাদেশের উদ্যোক্তাদের উদ্যোগ—সব মিলিয়ে ত্রিমুখী মেলবন্ধনে দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল হতে পারে।
অন্যদিকে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ভারতের আশ্রয় দেওয়া এবং সেখান থেকে রাজনৈতিক তৎপরতার সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি ঢাকার অস্বস্তি বাড়ালেও, বাংলাদেশ স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে—দীর্ঘস্থায়ী সম্পর্ক কোনো বিশেষ দল বা ব্যক্তির সঙ্গে নয়, বরং জনগণের সঙ্গে হওয়া উচিত। নয়াদিল্লির পক্ষ থেকে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে আইনি পর্যালোচনার কথা বলা হলেও, আস্থার সম্পর্ক গড়তে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো অত্যন্ত জরুরি।
শুধু আন্তর্জাতিক চুক্তি করলেই চলবে না; দেশের ভেতরেও সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। চুক্তিগুলো প্রকাশ্য রাখা, বিশেষ সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পরিবর্তে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক সুযোগ নিশ্চিত করা এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে হবে। প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্পজগতের চাহিদার মেলবন্ধন ঘটাতে পারলে তবেই এই অর্থনৈতিক নবযাত্রা অর্থবহ হয়ে উঠবে।
দীর্ঘ প্রায় দুই দশক একপেশে পররাষ্ট্রনীতির পর, বর্তমান গণতান্ত্রিক সরকার জনগণের ইচ্ছাকে ভিত্তি করে দেশের কূটনীতিকে বহুমাত্রিক ও ভারসাম্যপূর্ণ করে তুলেছে। আর এই যাত্রায় জাপান, চীন এবং বৃহত্তর আঞ্চলিক অংশীদারদের সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা নিশ্চিত করতে পারলে সত্যিই এক নতুন ভোরের আলোর দেখা পাবে বাংলাদেশ।
অনলাইন ডেস্ক 

























