
বেকার তরুণদের প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির মহান উদ্দেশ্যে হাতে নেওয়া হয়েছিল ‘ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি’। কিন্তু ময়মনসিংহে এই কর্মসূচির বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া এক বড় ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়েছে। প্রশিক্ষণ না দিয়েই ভুয়া বিল-ভাউচারে সম্মানী উত্তোলন, জন্মনিবন্ধন দিয়ে ভুয়া ব্যাংক হিসাব খোলা এবং মাঠকর্মীদের ভাতা বিতরণে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও চাঞ্চল্যকর এক ঘটনা—দুর্নীতির অনুসন্ধানের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনই গায়েব হয়ে গেছে যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তর থেকে।
অভিযোগকারীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ জেলার ১০টি উপজেলায় এই কর্মসূচির মোট বরাদ্দ ছিল ২৯২ কোটি ১১ লাখ ৫১২ টাকা। এর মধ্যে কেবল গৌরীপুর, হালুয়াঘাট, ফুলবাড়ীয়া ও ত্রিশাল—এই চার উপজেলায় প্রায় ১৮০ কোটি টাকা ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
তবে অভিযোগে উল্লেখিত উপজেলাভিত্তিক ব্যয়ের অঙ্কগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—
গৌরীপুরে ৪৭ কোটি টাকা
হালুয়াঘাটে ৩৭ কোটি টাকা
ফুলবাড়ীয়ায় ৪৪ কোটি টাকা
ত্রিশালে ৪৩ কোটি টাকা
এই চার অঙ্ক মিলে মোট হয় ১৭১ কোটি টাকা, যা দাবিকৃত ১৮০ কোটির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। ফলে মোট বরাদ্দ, প্রকৃত ব্যয়, অনিয়মিত লেনদেন এবং কথিত আত্মসাতের হিসাব নিয়ে আরও স্বচ্ছ ও দালিলিক প্রমাণের প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আলোচিত এই অনিয়মের সবচেয়ে গুরুতর দিকটি হলো—বাস্তবে প্রশিক্ষণ না দিয়েই প্রশিক্ষকদের নামে মোটা অঙ্কের সম্মানী উত্তোলনের অভিযোগ। মামলার আবেদন ও তথ্য অনুযায়ী, কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে অস্বাভাবিকসংখ্যক ক্লাস দেখানো হয়েছে:
ত্রিশাল উপজেলায়: ফারজানা পারভীনের নামে ৪৫২টি, নুরুজ্জামান চৌধুরীর নামে ৪৩৪টি, জোয়াহের আলী মিয়ার নামে ৪৩৪টি এবং আবু জুলহাসের নামে ৮৩৩টি ক্লাস দেখানো হয়েছে।
অন্যান্য উপজেলায়: সামগ্রিকভাবে ফারজানা পারভীনের নামে ১,৮৪৮টি, নুরুজ্জামান চৌধুরীর নামে ১,৭০৮টি এবং জোয়াহের আলী মিয়ার নামে ১,৭০৪টি ক্লাস দেখানোর তথ্য রয়েছে।
নিয়ম অনুযায়ী প্রথম ব্যাচ সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা এবং দ্বিতীয় ব্যাচ দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলার কথা থাকলেও বাস্তবে এত বিপুলসংখ্যক ক্লাস কীভাবে এবং কখন অনুষ্ঠিত হলো—তা নিয়ে তীব্র সংশয় দেখা দিয়েছে।
মাঠকর্মীদের ভাতা বিতরণে জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার করে বেসরকারি ব্যাংকে ভুয়া হিসাব খোলা এবং জাল বিল-ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও কম চাঞ্চল্যকর নয়। ত্রিশাল উপজেলায় ৪৩ কোটি টাকার ব্যয় নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর জেলা প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটির সুপারিশে ভুয়া ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে উত্তোলিত ৫৩ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরতের সুপারিশ করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়। তবে এই অর্থ আসলেই ফেরত দেওয়া হয়েছে কি না বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার কী ফল এসেছে, তার স্পষ্ট সুরাহা আজও মেলেনি।
পাশাপাশি, তিন কর্মকর্তার স্বজনদের মাধ্যমে কানাডায় প্রায় ৩০ কোটি টাকা পাচারের যে অভিযোগ তোলা হয়েছে, তারও কোনো শক্ত ব্যাংক নথি বা আন্তর্জাতিক আর্থিক লেনদেনের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অর্থ অনিয়মের অভিযোগের মধ্যেই সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ঘাটতির বিষয়টি সামনে আসে যখন জানা যায়, ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচির অনিয়ম সংক্রান্ত একটি মূল তদন্ত প্রতিবেদন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিবের দপ্তর থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। এছাড়া ভোলা অনুসন্ধানী কর্মকর্তা উপপরিচালক রোকন উদ্দিনের দপ্তর থেকেও অনুমতি ছাড়া নথিপত্র সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে, যে বিষয়ে তিনি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) পর্যন্ত করেছেন। সিসিটিভি ফুটেজে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে শনাক্ত করার দাবি করা হলেও পুরো ঘটনাটি প্রশাসনিক অবহেলা নাকি তদন্তকে প্রভাবিত বা বাধাগ্রস্ত করার সুপরিকল্পিত চেষ্টা, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সাবেক ও বর্তমান মিলিয়ে ২১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর নাম এই পুরো বিতর্কে উঠে এসেছে। যাঁদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন—
সাবেক সচিব ড. মহিউদ্দিন
বর্তমান সচিব মাহাবুব উল আলম
যুগ্ম সচিব লুলু বিলকিছ ও ড. শেখ মোহাম্মদ জোবায়েদ হোসেন
যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের পরিচালক মফিজুল ইসলাম
উপসচিব ডা. জহিরুল ইসলাম ও রবিউল ইসলাম
এবং বিভিন্ন উপজেলার দায়িত্বে থাকা বেশ কয়েকজন উপপরিচালক ও যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা (ফারজানা পারভীন, নুরুজ্জামান চৌধুরী, জোয়াহের আলী মিয়া, নন্দন কুমার দেবনাথ, আবু জুলহাস, নূর মোহাম্মদ প্রমুখ)।
উল্লেখ্য, আইনি প্রক্রিয়ায় অভিযোগ বা নাম আসা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। অভিযুক্তদের বক্তব্য এবং দালিলিক প্রমাণ যাচাইয়ের মাধ্যমেই কেবল প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হতে পারে।
সাংবাদিক ও অভিযোগকারী মো. খায়রুল আলম রফিকের করা মামলার সূত্র ধরে বর্তমানে দুদকের ময়মনসিংহ জেলা কার্যালয় বিষয়টি অনুসন্ধান করছে। আদালতের নির্দেশে দুদকের দুই উপসহকারী পরিচালক তদন্তের দায়িত্বে রয়েছেন।
ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচিটি নেওয়া হয়েছিল বেকার যুবকদের স্বাবলম্বী করার মহৎ উদ্দেশ্যে। কিন্তু সেই তহবিলের ব্যবহার, ব্যাংক হিসাবের স্বচ্ছতা, বিল-ভাউচারের সত্যতা এবং খোদ সরকারি দপ্তর থেকে তদন্তের নথি গায়েব হয়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো আজ পুরো প্রশাসনিক শৃঙ্খলাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, দুদকের নিরপেক্ষ অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তৎপরতা শেষ পর্যন্ত জনসমক্ষে প্রকৃত সত্য ও হিসাব তুলে আনতে পারে কি না।
অনলাইন ডেস্ক 



















