
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভূমি অফিসে দীর্ঘ সময় কানুনগো হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর এবার সিলেট জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের ভূমি অধিগ্রহণ শাখায় অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা হিসেবে পদোন্নতি পেয়েছেন শ্রীপদ দেব। তবে এই পদোন্নতি, একই শাখায় পুনরায় পদায়ন, জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন এবং তাঁর অতীত রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নিয়ে নানা প্রশ্ন ও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের দাবি, সরকারি চাকরির সীমিত বেতনের বিপরীতে তাঁর নামে-বেনামে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার বিষয়টি নিয়ে নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৫ সালের জাতীয় বেতন স্কেলে ২০২১ সাল পর্যন্ত শ্রীপদ দেবের পদটি ১৩তম গ্রেডভুক্ত (মূল বেতন ১১,০০০ থেকে ২৬,৫৯০ টাকা) ছিল। পরবর্তীতে তা ১০ম গ্রেডে উন্নীত হয়।
তবে তাঁর নিজ এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, শ্রীমঙ্গল সদরের মাঝেরগাঁও গ্রামের ঠাকুর চাঁদ দেবের ছেলে শ্রীপদ দেব নিজ এলাকায় কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে একটি বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ করেছেন। এ ছাড়াও শ্রীমঙ্গল, মৌলভীবাজার ও সিলেট শহরে তাঁর নামে-বেনামে একাধিক জমি, প্লট ও ফ্ল্যাট রয়েছে। এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে ভারতের কলকাতায়ও ফ্ল্যাট বা বাড়ি অর্জনের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। এসব সম্পত্তির প্রকৃত মালিকানা, ক্রয়মূল্য এবং অর্থের উৎস নিয়ে জনমনে তীব্র অসন্তোষ বিরাজ করছে।
স্থানীয় সূত্র ও সাবেক সহকর্মীদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন কৃষিমন্ত্রী উপাধ্যক্ষ আব্দুস শহীদ এবং শ্রীমঙ্গল উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান বানু লাল রায়ের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাজন ছিলেন শ্রীপদ দেব। ওই রাজনৈতিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে তিনি ভূমি-সংক্রান্ত বিভিন্ন কার্যক্রমে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করতেন।
অভিযোগ রয়েছে, শ্রীমঙ্গল উপজেলা ভূমি অফিসে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন অনিয়ম ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠলেও প্রভাবশালী মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি। সেই রাজনৈতিক সুরক্ষাকে কাজে লাগিয়েই তিনি বর্তমানে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে গেছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
নিয়মবহির্ভূতভাবে একই কর্মস্থলে দীর্ঘ ৫ বছরের বেশি সময় কানুনগো হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর, অতিরিক্ত ভূমি অধিগ্রহণ কর্মকর্তা পদে পদোন্নতি পেয়ে আবারও একই শাখায় পদায়ন পাওয়ার বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘকাল একই স্থানে থাকার কারণে সেখানে তাঁর একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যা শাখার অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও অস্বস্তি তৈরি করেছে। তাঁর পদোন্নতি ও পদায়নের ক্ষেত্রে সরকারি বিধিবিধান, জ্যেষ্ঠতা এবং প্রশাসনিক নীতিমালা যথাযথভাবে মানা হয়েছে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান সচেতন মহল।
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলন চলাকালে সংঘটিত সহিংসতার ঘটনায় শ্রীপদ দেবের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ছাত্র হত্যা ও আন্দোলনকারীদের ওপর হামলার ঘটনায় দায়েরকৃত মামলার এজাহারে তাঁর নাম রয়েছে। এত গুরুতর মামলার আসামি হওয়া সত্ত্বেও কীভাবে তাঁর পদোন্নতি ও বহাল তবিয়তে পদায়ন হলো—তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে স্থানীয় জনতা।
উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য শ্রীপদ দেবের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। এমনকি তাঁর হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো উত্তর দেননি।
শ্রীপদ দেবের পদোন্নতি ও পদায়নের পুরো প্রক্রিয়া, তাঁর সম্পদের প্রকৃত উৎস, মামলা-সংক্রান্ত তথ্য এবং দায়িত্ব পালনকালে ওঠা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করেছেন সচেতন মহল।
অনলাইন ডেস্ক 



















