
উত্তরবঙ্গের অর্থনৈতিক করিডোর শক্তিশালী করা এবং ভারতের সঙ্গে নৌ-বাণিজ্য বাড়ানোর সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে নির্মিত হচ্ছে আধুনিক চিলমারী নদীবন্দর। তবে এই মেগা প্রকল্পের মাটির নিচের ভিত্তি ও অবকাঠামোগত কাজ নিয়েই এখন উঠেছে চাঞ্চল্যকর ও গুরুতর সব প্রশ্ন। অনুমোদিত নকশা ও কার্যাদেশের তোয়াক্কা না করে মাঠপর্যায়ে পাইলিংয়ে ব্যাপক গরমিল, বিকল্প নকশার অবৈধ ব্যবহার, সাব-কন্ট্রাক্টিংয়ের নামে নয়ছয় এবং ভুয়া পরিমাপ বই (এমবি) তৈরি করে কোটি কোটি টাকা উত্তোলনের অভিযোগ সামনে এসেছে।
অভিযোগগুলো একপাক্ষিক ও প্রাথমিক হলেও, স্বাধীন তদন্তে এগুলোর সত্যতা মিললে এটি শুধু একটি প্রকল্পের অনিয়ম নয়, বরং রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর নিরাপত্তা এবং জনস্বার্থের অর্থ ব্যবস্থাপনার ওপর এক বিরাট প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়াবে।
বিআইডব্লিউটিএ-এর বাস্তবায়নাধীন এই প্রকল্পের প্রাথমিক অনুমোদিত ব্যয় ছিল ২৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা। পরবর্তীতে সংশোধিত ডিপিপিতে (ডিপিপি) তা বাড়িয়ে ৩৩৫ কোটি ৫৯ লাখ টাকা করা হয়। নদী তীর সংরক্ষণ, জেটি ও পন্টুন, টার্মিনাল ভবন, সাইট ডেভেলপমেন্ট এবং গভীর পাইলিং ছিল এর মূল কাজ। প্রকল্প পরিচালকের (পিডি) দায়িত্বে রয়েছেন বিআইডব্লিউটিএর নির্বাহী প্রকৌশলী (পুর) মোঃ আবুল কালাম আজাদ মোল্লা।
উত্থাপিত অভিযোগ অনুযায়ী, অনুমোদিত কার্যাদেশ ও বিওকিউ (BOQ)-তে পাইলের ব্যাস ৫০০ মিলিমিটার এবং দৈর্ঘ্য ৪০.৫০ মিটার নির্ধারিত থাকলেও বাস্তবে মাঠপর্যায়ে ৩০০ মিলিমিটার ব্যাস এবং ২৩ মিটার দৈর্ঘ্যের পাইল করা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। অর্থাৎ ব্যাসে প্রায় ৪০ শতাংশ এবং দৈর্ঘ্যে প্রায় ৪৩.২১ শতাংশ ঘাটতি রাখা হয়েছে।
কাঠামোগত প্রভাব: প্রকৌশლগত হিসাবে পাইলের ব্যাস কমলে তার ক্রস-সেকশনাল ক্ষেত্রফল রৈখিকভাবে নয়, বরং ব্যাসের বর্গের অনুপাতে কমে যায়। ৫০০ মিলিমিটার ব্যাসের ক্ষেত্রফল প্রায় ০.১৯৬৩ বর্গমিটার হলেও ৩০০ মিলিমিটারে তা নেমে আসে ০.০৭০৭ বর্গমিটারে—যা প্রায় ৬৪ শতাংশ কম।
এছাড়া ১৬ মিলিমিটারের ১০টি প্রধান রডের পরিবর্তে মাত্র ৭টি রড ব্যবহার এবং ৪৫০ মিলিমিটার ইনার ডায়ারের স্টিল কেসিং না বসানোরও অভিযোগ রয়েছে।
প্রকল্পটিতে দাপ্তরিক প্রক্রিয়া এড়িয়ে ‘টাইপ-১’ ও ‘টাইপ-২’ নামে বিকল্প ড্রয়িং ব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রশ্ন উঠেছে—মূল নকশা পরিবর্তনের এই এখতিয়ার কার ছিল, কে বা কারা এই সংশোধিত নকশা তৈরি ও অনুমোদন করেছেন এবং কেন্দ্রীয় নথিতে এর কোনো বৈধ কপি আছে কি না।
প্রকল্পের মূল কার্যাদেশ পেয়েছিল ‘কেএসএল-এসইএল জেভি’ (Khandaker Shahin Ahmed Ltd & Sign Engineering Ltd JV)। কিন্তু মাঠপর্যায়ে রড কাটিং ও বাইন্ডিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো গোপনে ‘মায়ের দোয়া কনস্ট্রাকশন’ (স্বত্বাধিকারী: মোঃ নাসির উদ্দিন)-এর কাছে সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়া হয়। চুক্তির শর্ত ভেঙে এই সাব-কন্ট্রাক্ট দেওয়ার পেছনে কার কার মদদ ছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে অর্থপ্রবাহ ও সুনির্দিষ্ট ব্যাংক হিসাবের ব্যবহার নিয়ে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব হিসাবের পরিবর্তে ‘ডি. জি. বাংলা’ (DG BANGLA)-র এনআরবি ব্যাংক, মিরপুর শাখা এবং পূবালী ব্যাংকের একটি হিসাবে প্রকল্পের বিল স্থানান্তরের তথ্য পাওয়া গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প পরিচালক মোঃ আবুল কালাম আজাদ মোল্লার স্বাক্ষরিত পেমেন্ট সার্টিফিকেটের মাধ্যমে এই অর্থ সরিয়ে নেওয়া হয়। এর একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট অনুপাতে আরশাদ পারভেজের নামে ৩ কোটি ৩৭ লাখ ৫৩ হাজার টাকা এবং প্রকল্প পরিচালক মোঃ আবুল কালাম আজাদ মোল্লার নামে ২ কোটি ৭৬ লাখ ১৬ হাজার টাকা ভাগাভাগি হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সজল চন্দ্র দত্তের নামও আলোচনায় এসেছে।
সাইট ডেভেলপমেন্টের ক্ষেত্রে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য রয়েছে। কোনো কোনো অংশে ঠিকমতো বালু ভরাট না করেই ভুয়া পরিমাপ বই (Measurement Book বা MB) তৈরি করে শতভাগ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে পাইলিংয়ের স্টিল কেসিংয়ের কাজ না করেই টাকা তুলে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।
তৎকালীন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রীর এপিএস বাশার এবং ডি. জি. বাংলার আরশাদ পারভেজের রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রকল্পের ভেতরের সব আপত্তি ধামাচাপা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এমনকি এই অনিয়মের তথ্য সংগ্রহ করতে যাওয়া সংবাদকর্মীদের ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।
এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক মোঃ আবুল কালাম আজাদ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ঠিকাদারি পক্ষ বা অন্য অভিযুক্তদের কাছ থেকেও কোনো সন্তোষজনক কারিগরি ব্যাখ্যা মেলেনি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, চিলমারী নদীবন্দরের মতো একটি সংবেদনশীল ও কৌশলগত রাষ্ট্রীয় প্রকল্পের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে অবিলম্বে বুয়েটের মতো নিরপেক্ষ কারিগরি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পাইল ইন্টিগ্রিটি টেস্ট (PIT), পাইল লোড টেস্ট এবং মাটির ভারবহন ক্ষমতা যাচাই করা জরুরি। পাশাপাশি, ফরেনসিক ব্যাংকিং ট্রেইলের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের সত্যতা খতিয়ে দেখা উচিত। অভিযোগ প্রমাণিত হলে যেমন দোষীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তেমনি অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের সম্মান ও দায়মুক্তি নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অনলাইন ডেস্ক 



















