
হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলায় দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ আকলিমা আক্তার (৩২)-এর রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেছেন এক মানবাধিকারকর্মী। যৌতুকের দাবিতে নির্যাতন, ময়নাতদন্ত ছাড়াই লাশ দাফন এবং পুলিশের ভূমিকা ও সালিশ-মীমাংসার নামে ধামাচাপার চেষ্টার অভিযোগ এনে হবিগঞ্জ পুলিশ সুপার বরাবরে একটি আবেদন করা হয়েছে।
আজ বুধবার (২৮ অক্টোবর) ‘আইন সহায়তা কেন্দ্র (আসক)’ ও ‘মানবাধিকার ফাউন্ডেশন’ হবিগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরী (ইলিয়াস) এই আবেদন করেন। গত ২৫ অক্টোবর ‘বাংলা এডিশন’-এ এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন, থানায় অভিযোগ গ্রহণ ও পরবর্তী কার্যক্রম যাচাই, সালিশে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা এবং নিহতের পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি জানানো হয়।
আবেদনে উল্লেখ করা হয়, মাধবপুর উপজেলার বুল্লা ইউনিয়নের পৈলাবাড়ি গ্রামের চান মিয়া চৌধুরীর সঙ্গে একই গ্রামের আকলিমা আক্তারের প্রায় ১৬ বছর আগে বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে তিনটি সন্তান রয়েছে। বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের দাবিতে আকলিমার ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। পরবর্তীতে স্বামী চান মিয়া দ্বিতীয় বিয়ে করেন বলেও অভিযোগে বলা হয়। সম্প্রতি ইউরোপে যাওয়ার জন্য স্ত্রীর কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয় এবং টাকা দিতে না পারায় তাঁকে মারধর করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব নির্যাতনের সঙ্গে তাঁর মৃত্যুর কোনো যোগসূত্র আছে কি না, তা খতিয়ে দেখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
গত ১৭ অক্টোবর আকলিমা অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে বিভিন্ন হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়ার পথে মাধবপুরে অ্যাম্বুলেন্সে তাঁর মৃত্যু হয় বলে পরিবার জানায়। তবে মৃত্যুর সঠিক কারণ, মৃত্যুর আগে নির্যাতনের শিকার হওয়া এবং চিকিৎসাসংক্রান্ত নথির সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে আবেদনকারী পক্ষ। কোনো ময়নাতদন্ত ছাড়াই দ্রুত লাশ দাফন করায় প্রকৃত রহস্য ধামাচাপা পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রকাশিত সংবাদের বরাত দিয়ে আবেদনে বলা হয়, গত ২১ অক্টোবর রাতে হবিগঞ্জ আইনজীবী সমিতির এক শিক্ষানবিশ আইনজীবী কামাল খান মাধবপুর থানায় উপস্থিত হয়ে নিহতের ভাই সুমন চৌধুরীকে বাদী করে একটি লিখিত অভিযোগ প্রস্তুত করান। ওই অভিযোগে চান মিয়া চৌধুরী ও তাঁর বোনজামাই জালাল মিয়াসহ পাঁচজনকে অভিযুক্ত করা হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ওই রাতেই পুলিশ চান মিয়া চৌধুরীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। কিন্তু পরবর্তীতে কোন আইনি প্রক্রিয়ায় তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হলো, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় থানার সাধারণ ডায়েরি (জিডি), অভিযোগ রেজিস্টার এবং সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মকর্তাদের ভূমিকা তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
গৃহবধূর দাফনের পর স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির উদ্যোগে একটি সালিশ ও আপস-মীমাংসা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। ছাতিয়াইন গ্রামের নানু মিয়া, সেলিম মিয়া ও কবির খান চৌধুরীসহ কয়েকজনের নাম এতে উঠে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, অর্থের বিনিময়ে মধ্যস্থতা করে উভয় পক্ষের স্বাক্ষরসংবলিত স্ট্যাম্পে সমঝোতার শর্ত লিখে তা গোপন করা হয়েছে। এই সালিশের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং নিহতের পরিবার স্বেচ্ছায় এই সমঝোতায় রাজি হয়েছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
মামলা বা আইনি পদক্ষেপে না যাওয়ার জন্য নিহতের পরিবারকে ভয়ভীতি ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবারটি যাতে স্বাধীনভাবে আইনি প্রতিকার চাইতে পারে এবং তদন্তে সহযোগিতা করতে পারে, সেজন্য তাদের পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মী নুরুল হুদা চৌধুরী।
নুরুল হুদা চৌধুরী (ইলিয়াস) বলেন, “কাউকে আগাম অপরাধী সাব্যস্ত করা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন, নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করা এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা প্রয়োজন।” তিনি এই মানবিক ও আইনি গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
অনলাইন ডেস্ক 























