
“সরকার আসে, সরকার যায়, কিন্তু আমলারা বহাল তবিয়তে থেকে যায়”—বাংলাদেশের রাজনীতি ও প্রশাসনের চিরন্তন এই প্রবাদের বাস্তব রূপ যেন মুন্সিগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার মো. রমজান খান। রাজনৈতিক ক্ষমতার পটপরিবর্তন কিংবা বৈষম্যবিরোধী গণঅভ্যুত্থান—কোনো কিছুতেই থিতু হয়নি এই সুবিধাভোগী কর্মকর্তার দুর্নীতির চাকা। সাবেক আওয়ামী সরকারের আমলের ঘনিষ্ঠ সহযোগী থেকে রাতারাতি খোলস পাল্টে বর্তমান প্রশাসনের ছায়ায় জায়গা করে নেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পতিত সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের নিজ উপজেলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় বাড়ি হওয়ার সুবাদে বিগত ১৫ বছর ক্ষমতার চূড়ায় ছিলেন রমজান খান। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ডিনারে অংশ নেওয়ার মতো বিরল সুযোগ পান তিনি, যা প্রশাসনের নীতিনির্ধারক মহলে তাঁর সুদূরপ্রসারী প্রভাব ও আস্থার বিষয়টি স্পষ্ট করে। ২০০৪ সালে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে যোগদানের আগে তাঁর বিরুদ্ধে জেল পুলিশ থাকাকালীন বন্দি নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ থাকলেও, সাব-রেজিস্ট্রার হওয়ার পর তাঁর ভাগ্যের মোড় ঘুরে যায়। নরসিংদী সদর, ফতুল্লা, গুলশান ও সিরাজদিখানসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনকালে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে তিনি অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েন বলে অভিযোগ রয়েছে।
ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের কর্মী থেকে শুরু করে আওয়ামী আমলের কট্টর ক্যাডার—সব পরিচয় পাশ কাটিয়ে ৫ আগস্টের পর ভোল পাল্টে নিজেকে বিএনপির ‘খাস লোক’ হিসেবে জাহির করতে শুরু করেন রমজান খান। অভিযোগ রয়েছে, বিএনপির শীর্ষ পর্যায়ের আইনবিষয়ক নেতৃত্বের ছত্রছায়ায় তিনি বর্তমানে শুধু নিজেকেই রক্ষা করেননি, বরং এলাকার বহু আওয়ামী পন্থী নেতাকর্মীকে বিএনপিতে পুনর্বাসিত করার নেপথ্য কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন। এই অদৃশ্য রাজনৈতিক শক্তির জোরেই নিয়মবহির্ভূতভাবে জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নেন তিনি।
বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে জোট বেঁধে তিনি ব্রসা (BRSA) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট পদের আড়ালে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করছেন। চট্টগ্রাম সদর, গুলশান, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও কক্সবাজারসহ বিগত এক বছরে দেড় শতাধিক সাব-রেজিস্ট্রারকে বদলি করে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
অভিযোগে প্রকাশ, নীলফামারীর জলঢাকার সাব-রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান মোল্লাকে চট্টগ্রাম বা রূপগঞ্জে দেওয়ার নাম করে ১ কোটি ২০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করার পাশাপাশি সীতাকুণ্ডে বদলি এবং পরে টাকা নিয়ে সেই আদেশ বাতিল করার মতো প্রতারণার ঘটনাও ঘটিয়েছেন তিনি। আইন মন্ত্রণালয়ের বিতর্কিত যুগ্ম সচিব বিকাশ কুমার সাহার ডান হাত হিসেবে পরিচিত রমজান খানের গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্স ক্যাফেতে বসা নিয়মিত আসর থেকেই পরিচালিত হতো এই বদলি বাণিজ্যের গোপন কার্যক্রম।
রমজান খানের অবৈধ আয়ের সাম্রাজ্য দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও বিস্তৃত। তাঁর শ্যালকের মাধ্যমে দুবাই, লন্ডন ও মালয়েশিয়ায় প্রায় অর্ধডজন বাড়ি এবং গুলশানে নামে-বেনামে ৩০টি ফ্ল্যাট ও প্লটের বুকিং রয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়া আখাউড়ায় শত শত একর জমি এবং দেশজুড়ে প্রায় ৩০ জন ব্যক্তিগত দালাল ও প্রতিনিধির একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।
বর্তমানে গুঞ্জন রয়েছে যে, মুন্সিগঞ্জ থেকে ঢাকা জেলার তেজগাঁও রেজিস্ট্রেশন কমপ্লেক্সে ঢাকা জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে পদায়ন নেওয়ার পাঁয়তারা চালাচ্ছেন রমজান খান। তিনি ঢাকায় আসলে রাজধানীর ২২টি সাব-রেজিস্ট্রি অফিস দুর্নীতির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা।
গত বছর মে মাসে আইন উপদেষ্টা বরাবর তাঁর বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থ পাচারের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দিয়েও এখনো দৃশ্যমান কোনো বিচার না হওয়ায় জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। বৈষম্যহীন নতুন বাংলাদেশে প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে লুকিয়ে থাকা এমন সুযোগসন্ধানী ও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















