
সরকারি চাকরিতে বদলি ও পদায়ন একটি নিয়মিত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হলেও, গণপূর্ত অধিদপ্তরের (পিডব্লিউডি) ইলেকট্রো-মেকানিক্যাল শাখার উপসহকারী বা সহকারী প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিনের কর্মকাণ্ড ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন। ক্ষমতার অপব্যবহার, বেনামে ঠিকাদারি পরিচালনা, অর্থ আত্মসাৎ এবং ঘুষ বাণিজ্যের মাধ্যমে বারবার নিজের পোস্টিং ঢাকায় টিকিয়ে রাখার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে কুমিল্লায় বদলি করলেও মাত্র দেড় বছরের মাথায় তিনি ফের ঢাকার একই প্রভাবশালী পদে ফিরে আসেন। বর্তমানে তার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকা ডিভিশন-৬-এ কর্মরত থাকাকালীন শামসুল আরেফিনের প্রভাব বিস্তারের ঘটনা সবচেয়ে বেশি আলোচিত হয়। তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী পবিত্র কুমারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি ওই ডিভিশনের বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে একচ্ছত্র আধিপত্য গড়ে তোলেন। প্রকল্পের প্রাক্কলন বা এস্টিমেট তৈরি থেকে শুরু করে কাজের তদারকি এবং চূড়ান্ত বিল অনুমোদন—সব ক্ষেত্রেই তার একক নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে অভিযোগ ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার জানান, বিল ছাড়ের প্রতিটি ধাপে তাকে নির্দিষ্ট হারে কমিশন দিতে হতো। কমিশন বা দাবিমুক্ত অর্থ না পেলে নথিপত্র আটকে নানা জটিলতা তৈরি করা হতো। এক ঠিকাদার বলেন, “উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে তিনি টাকা দাবি করতেন। টাকা না দিলে বিল আটকে থাকত, তাই বাধ্য হয়েই অনেকে তা মিটিয়েছেন।” অন্য এক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, “তিনি বলতেন—‘উপরের লোকজন ঠিক আছে, শুধু টাকা দাও।’ পরবর্তীতে দেখা গেছে, কাজও হয়নি, সেই টাকাও আর ফেরত পাওয়া যায়নি।”
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে প্রকৌশলী মো. শামসুল আরেফিনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ‘পরে কথা বলব’ বলে সংযোগ কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি কোনো সাড়া দেননি।
প্রশাসনিক নিয়ম অনুযায়ী নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে কর্মকর্তাদের ঢাকার বাইরে বদলি করার বিধান রয়েছে। তবে শামসুল আরেফিন কর্মজীবনের সিংহভাগ সময়ই বিভিন্ন কৌশলে ঢাকায় কাটিয়েছেন। জুলাই আন্দোলনের পর তাকে কুমিল্লায় বদলি করা হলেও রহস্যজনকভাবে মাত্র দেড় বছরের মাথায় তিনি আবার ঢাকার একই অফিসে সমমানের পদে ফিরে আসেন। গণপূর্তের অভ্যন্তরীণ মহলে গুঞ্জন রয়েছে, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ঘটলেও একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটকে ম্যানেজ করে তিনি বারবার নিজের অবস্থান সুরক্ষিত করেছেন। তবে এই বদলি প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম ছিল কি না, তা স্বাধীনভাবে শতভাগ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।
শামসুল আরেফিনের বৈধ আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ বিপুল সম্পদের তথ্যও সামনে এসেছে। অনুসন্ধানী সূত্র জানায়, রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন অভিজাত এলাকা এবং আবাসন প্রকল্পে তার ও নিকটাত্মীয়দের নামে একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট রয়েছে। সরকারি চাকরির বেতনের সঙ্গে এই বিশাল সম্পত্তির মালিকানার ফারাক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা।
দুদক সূত্র জানায়, তার বিরুদ্ধে স্বনামে-বেনামে ঠিকাদারি ব্যবসা পরিচালনা ও প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগটি আমলে নিয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধান শুরু হয়েছে এবং বিভিন্ন নথিপত্র তলব করা হয়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আশরাফুল ইসলাম এ বিষয়ে বলেন, “কেউ ঊর্ধ্বতন কারো নাম ভাঙিয়ে সুবিধা নিয়ে থাকলে তার দায় তাকেই নিতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অনৈতিক কাজের সুযোগ নেই। অভিযোগ প্রমাণিত হলে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, “সরকারি প্রকৌশল বিভাগে সিন্ডিকেট ও ক্ষমতার অপব্যবহার নতুন নয়। তবে বারবার একই ব্যক্তির ঢাকায় ফেরা এবং অবৈধ সম্পদের অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর। দুদকের এই অনুসন্ধান স্বাধীনভাবে এগোতে দিতে হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরী জানান, “অধিদপ্তর কোনো ব্যক্তিগত অনিয়ম বা দুর্নীতির দায় নেবে না। স্বচ্ছতা রক্ষায় আমরা বদ্ধপরিকর। শামসুল আরেফিনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। দুদক স্বাধীনভাবে তদন্ত শুরু করেছে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে সব ধরনের দাপ্তরিক সহযোগিতা দেওয়া হবে।”
সাধারণ ঠিকাদার ও অংশীজনদের মতে, দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত হলে অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্তসহ কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি, অন্যথায় এই সিন্ডিকেট চক্র আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















