Dhaka ০৫:১৯ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
শিরোনাম
জাপানি ‘ও-সোজি’ মডেলে ঢাকার ২১ বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ পাইলট প্রকল্প শুরু ভাঙ্গায় যুবদলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালিত: সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য প্রতিহত করার আহ্বান দেশে আর কোনো গুম-বিচারবহির্ভূত হত্যা দেখতে চায় না সরকার: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রেমিট্যান্স আহরণ ও সেবা আরও সহজ করতে ওয়ান ব্যাংকের সাথে নগদের কৌশলগত চুক্তি রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও থামেনি বিএডিসির বীজ সিন্ডিকেট: বহাল তবিয়তে ‘বঙ্গ অ্যাগ্রিটেক’ মিরপুরে ডিএনসিসির বড় অভিযান: গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো দুই হাজার অবৈধ দোকান বন বিভাগে ‘পে-ফিক্সেশন’ বাণিজ্য: ফাইলপ্রতি ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উৎকোচ আদায়ের অভিযোগ, জিম্মি সাধারণ কর্মচারীরা পঞ্চগড় বোদা ভূমি অফিসে ঘুষ বাণিজ্য: তিন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ভিডিও ভাইরালের পর ক্ষোভ কুড়িগ্রাম সদর খাদ্যগুদামে ২ কোটি টাকার চাল ও ধান আত্মসাৎ: দুদকের মামলা চার কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মুন্সীগঞ্জে মেঘনা নদীতে অভিযান: ১ লাখ মিটার জাল ও ২৫০ কেজি ইলিশসহ আটক ৩

ইতিহাসের মোড় ঘোরানো অভ্যুত্থান

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে সংঘটিত ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। কোটা সংস্কার দাবিতে শুরু হওয়া একটি সাধারণ শিক্ষার্থী আন্দোলন পরবর্তীকালে সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে পূর্ণাঙ্গ গণবিপ্লবে রূপ নেয়; যা দীর্ঘ ১৬ বছরের আওয়ামী শাসনের অবসান ঘটায়। আর এ আন্দোলনের নেপথ্যে থেকে কাজ করেন দেশের রাজনীতিসংশ্লিষ্টরা। দমনপীড়নের মাধ্যমে সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের দীর্ঘদিন কোণঠাসা করে রাখা হয়।

বিশ্লেষকরা জানান, রক্তক্ষয়ী এ অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্ম একটি নতুন রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি স্থাপন করে। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের শুরুতে সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির যৌক্তিক সংস্কারের দাবিতে রাজপথে নামেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। আন্দোলন শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও তৎকালীন সরকারের দমনপীড়ন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অতি তৎপরতা এবং ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গসংগঠনগুলোর সহিংস হামলায় পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।

বিশ্লেষক ও আন্দোলনকারীদের মতে অভ্যুত্থানের ক্যালেন্ডারে কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ঘটনা আন্দোলনের তীব্রতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে ১৬ জুলাই রংপুরে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদের বুক পেতে দেওয়া এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হওয়ার ঘটনাটি আন্দোলনের গতিপথ সম্পূর্ণ বদলে দেয়। এ দৃশ্য সারা দেশের সাধারণ মানুষকে স্তব্ধ ও ক্ষুব্ধ করে তোলে।

আন্দোলন দমাতে ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট, সান্ধ্য আইন (কারফিউ) জারি এবং নির্বিচারে গুলি চালানো হলেও শিক্ষার্থীরা দমে যাননি। শত শত শিক্ষার্থীর আত্মাহুতি আন্দোলন সাধারণ মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেয়। সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর রাষ্ট্রীয় সহিংসতার প্রতিবাদে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন কোটা সংস্কারের গন্ডি পেরিয়ে সরকারের পদত্যাগের ‘এক দফা’ ঘোষণা করে।

৪ আগস্ট দেশজুড়ে তীব্র সংঘাতের পর ৫ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকে লাখ লাখ মানুষ ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচিতে অংশ নিতে রাজধানীর দিকে রওনা হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে ছাত্র-জনতার জোয়ারের মুখে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। দুপুরের পরপরই লাখ লাখ মানুষ গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করে বিজয়োল্লাস প্রকাশ করে।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে এ অভ্যুত্থান কেবল কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফল ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিনের বঞ্চনা, দুঃশাসন, দুর্নীতি, গুমখুন এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। দেশের সাধারণ মানুষ, রাজনৈতিক দলের শীর্ষ থেকে তৃণমূলের নেতা-কর্মী, শ্রমজীবী এবং অভিভাবকরা তরুণদের এ লড়াইয়ে শামিল হয়ে একে একটি সফল গণ অভ্যুত্থানে পরিণত করেন। তাঁরা জানান, ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হওয়ার পর তারা তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। এরপর আওয়ামী লীগ নিজেদের অধীনে পরপর আরও তিনটি সংসদ নির্বাচন আয়োজন করে জয়লাভ করে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সংসদ নির্বাচনগুলোয় ব্যাপক কারচুপির অভিযোগ ওঠে। এর মাঝে ২০১৮ সালের নির্বাচন ছাড়া বাকি দুটি অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বয়কট করেছিল। এ সময় সরকার তাদের বিরোধীদের ওপর ব্যাপক নির্যাতন ও ধরপাকড় চালায়, বিরোধী দলের শীর্ষ নেতাদের বিভিন্ন মামলায় সাজা দেওয়ার মাধ্যমে দলগুলো নেতৃত্বশূন্য করে ফেলা হয়। এ সময়ে দেশের সব গণমাধ্যমে তথ্য প্রচার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয় এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮-এর মতো আইনের মাধ্যমে কঠোরভাবে জনসাধারণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ন্ত্রণ করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে অভ্যুত্থানের পর দেশে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয় এবং রাষ্ট্রের কাঠামোগত এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের কাজ শুরু হয়। পরে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত সাধারণ নির্বাচনে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতায় আসে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি। সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকায় আসে জামায়াত-এনসিপি জোট। আর কদিন পরই নতুন সরকারের ছয় মাস পূর্ণ হতে যাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে সত্যিকারের সমতাভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলার মতো বড় চ্যালেঞ্জগুলো এখনো রয়ে গেছে। এ অভ্যুত্থান প্রমাণ করেছে, জনগণের সম্মিলিত আকাক্সক্ষার সামনে কোনো স্বৈরাচারী ব্যবস্থাপনাই টিকে থাকতে পারে না। জুলাই-আগস্টের শহীদদের আত্মত্যাগ ও অর্জিত এই চেতনা ধারণ করে একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ে তোলাই এখন দেশবাসীর মূল লক্ষ্য।

জুলাইয়ের রক্তক্ষয়ী বিপ্লব ও পরবর্তী পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান ড. সাজ্জাদ সিদ্দিকী বাংলাদেশ প্রতিদিনকে বলেন, ‘পৃথিবীর সব বিপ্লবের পরে একটি শক্তি সুপারপাওয়ার হতে চায়। তখন অনেক ক্ষেত্রে বিপ্লব ব্যর্থ হয়। আমাদের দেশেও বিপ্লব হয়েছে। তবে সেটাকে এখনই ব্যর্থ বলা যাবে না। যে দেশে অর্থনৈতিক অবস্থা ভঙ্গুর থাকে, বেকারত্বের হার বেশি থাকে সেসব দেশে বিপ্লব-পরবর্তী অবস্থা চ্যালেঞ্জিং হয়। বাংলাদেশ এর ব্যতিক্রম নয়। বিপ্লবের পরে যে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্বে ছিল তারা তাদের কাজটা সঠিকভাবে করতে পারেনি। অনেক ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি করেছে। তবে এরপর যে নির্বাচনটা হয়েছে তা শান্তিপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। এতে সংসদে দ্বিদলীয় যে অবস্থা দেখছি, তা গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক মনে করি।’

একই প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘অভ্যুত্থানের পরে ইতিবাচক অনেক পরিবর্তন হয়েছে। বিশেষ করে কর্তৃত্ববাদের পতন হয়েছে, গণতন্ত্রে প্রবেশ করেছি, একটা ভালো নির্বাচন করতে পেরেছি। এগুলো তো অভ্যুত্থানের অর্জন। আরও একটা বড় অর্জন হলো রাষ্ট্র সংস্কারের আলোচনা দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।’ তিনি বলেন, ‘আরও অর্জন হয়তো আমরা করতে পারব। এজন্য সময় লাগবে।’ এক প্রশ্নে তিনি জানান, ‘কোনো রাষ্ট্র সংস্কার এক দিনে শেষ হয় না। বাংলাদেশেও রাষ্ট্র সংস্কার আলাপ এক দিনে শেষ হবে না। এখন রাষ্ট্র সংস্কারের যে আলাপ করতে পারছি সেটা আমাদের জন্য একটা বড় বিষয়। রাষ্ট্র সংস্কারের যে কাজটা শুরু হয়েছে এটা যদি অব্যাহত থাকে আমরা আমাদের রাষ্ট্রকে আরও এগিয়ে নিতে পারব।’

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

আলোচিত

জাপানি ‘ও-সোজি’ মডেলে ঢাকার ২১ বিদ্যালয়ে পরিচ্ছন্নতা ও ডেঙ্গু প্রতিরোধ পাইলট প্রকল্প শুরু